বিতর্কে বিশ্বাস

আজকে আমরা বিতর্কে বিশ্বাস সম্পর্কে আলোচনা করবো

 

বিতর্কে বিশ্বাস
বিতর্কে বিশ্বাস

 

বিতর্কে বিশ্বাস

বিশ্বাসের বিপক্ষে কথা বলতে হয় বলে অনেকে তো বিতর্ক ছেড়েই দিলেন। ছেড়ে দেওয়াটাই সমস্যার সমাধান নয়, বরং এটা পলায়ন প্রবৃত্তি। তাঁদের দুটো চিন্তায় ভিন্নমতের অবকাশ আছে। বিশ্বাসের বিপক্ষে বিতর্ক করলেই যে বক্তা একজন মিথ্যাবাদীতে পরিণত হবেন, এটা ঠিক নয়। বরং, শুধু বিশ্বাসের পক্ষে চিন্তা করলে চিন্তায় মৌলবাদ বা ধারণার জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হতে পারে। যিনি ধর্মের রাজনীতিতে বিশ্বাস করেন, তাঁরও জানা উচিত সমাজতন্ত্র কী। যিনি সমাজতন্ত্র বিশ্বাস করেন, তাঁরও জানা উচিত পুঁজিতন্ত্র কী।

কেউ হয়তো বলবেন, ওটা বিপরীত ধারার কয়েকটা বই পড়লেই জানা যায়। সমস্যাটা ওখানেই। ধর্মের রাজনীতিতে যাঁরা বিশ্বাস করেন, তাঁরা বিপরীত ধারার বই পড়া তো দূরের কথা, স্পর্শও করেন না সমাজতন্ত্রের গ্রন্থ কিংবা মার্ক্সের দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ। এই ভীতি ও ঘৃণাবোধ থেকে বিপরীত ধারার বই তাঁর কাছে হয়তো অপঠিতই থেকে যায়। একদিন তিনি হয়ে যান বড় ধর্মীয় নেতা। বিপরীত রাজনীতিতে এতই অসহিষ্ণু হয়ে পড়েন যে পারলে বিরুদ্ধ যাত্রীকে দমিত অথবা অপসৃত করেন ।

 

বিতর্কে বিশ্বাস
বিতর্কে বিশ্বাস

 

আমরা যে মতবাদে বিশ্বাস করি কিংবা যে মতবাদে অবিশ্বাস করি, উভয়ই পাঠ করা উচিত। বিতর্ক অবশ্যই এই প্রয়োজনীয়তা সৃষ্টি করে। বিতর্ক না করলেও এমনিতেই বিরুদ্ধ মতামত পড়া উচিত, জানা উচিত। সেটা অনেকেই করি না। একদল করি না ঘৃণা ও ভীতিতে, পাছে পিতৃসূত্রে প্রাপ্ত বিশ্বাস বুঝি নড়ে যায়। আরেক দল করি না আলস্যে। বলা বাহুল্য, আলস্যে বাঙালির দখল আছে, খ্যাতিও কম নয়। এ দ্বিবিধ বাধা দূর করে দেয় বিতর্ক। ইচ্ছায় হোক আর অনিচ্ছায়ই হোক, আমরা বিরুদ্ধ মত পড়ি। জানতে বাধ্য হই।

নিজেকে শক্তিশালী করতে বিরুদ্ধ মত জানার অবশ্যই প্রয়োজন আছে। মার্ক্স সমাজতন্ত্রের প্রবক্তা, কিন্তু সবচেয়ে বেশি পড়েছেন পুঁজিবাদ নিয়ে। তাঁর জগদ্বিখ্যাত গ্রন্থ পুঁজি, ১ম, ২য় ও ৩য় খণ্ড পুঁজিবাদেরই অনুপুঙ্খ বিশ্লেষণ।
নিজের মতকে শক্তিশালী ভিত দিতে হলে বিরুদ্ধ মতকে আক্রমণ করতে হবে, কিংবা বিরুদ্ধ মতের আক্রমণ প্রতিরোধ করার ক্ষমতা অর্জন করতে হবে। এর জন্য বিরুদ্ধ মতের ক্ষমতা ও দুর্বলতা জানতে হবে। রামচন্দ্র কোনো দিনই রাক্ষসরাজ রাবণকে পরাজিত করতে পারতেন না, যদি তিনি বিভীষণের মাধ্যমে রাবণের দুর্বলতা আবিষ্কার না করতে পারতেন, লক্ষ্মণও বধ করতে পারতেন না মেঘনাদকে।

প্রতিপক্ষের বিজয়ে বিশ্বাস না করলেও ওদের শক্তি ও দুর্বলতা অধ্যয়ন করা বীরের বিচক্ষণতা। মহাবীর ভীষ্মের দুর্বলতা না জানলে অর্জুন তাঁকে কখনো ঘায়েল করতে পারতেন না। কারণ, ভীষ্মের ছিল ইচ্ছামৃত্যু। শ্রীকৃষ্ণের পরামর্শে অর্জুন যেদিন শিখণ্ডীকে রথের সামনে বসালেন, ভীষ্ম ধনুর্বাণ প্রত্যাহার করলেন। একমাত্র গোড়ালিতে তির লাগলেই গ্রিক মহাবীর একিলিস মারা যাবেন, প্রতিপক্ষের এই দুর্বলতা না জানলে ট্রোজানরা কোনো দিনই একিলিসকে ঘায়েল করতে পারত না।

 

বিতর্কে বিশ্বাস
বিতর্কে বিশ্বাস

 

পৈতৃক সূত্রে একটা মতবাদে মৌলবাদী থাকার চেয়ে দশটা মত পড়ে যুক্তিতর্ক ও প্রজ্ঞার মাধ্যমে যেকোনো একটা বেছে নেওয়াই একজনের পক্ষে উপযুক্ত কাজ । প্রয়োজনে সে মানুষ নিজের একটা মতবাদ সৃষ্টি করবে। বিতর্ক এ আয়োজনকে সম্ভব করে তোলে, করে তোলে অনিবার্য।

আরেকটা আপত্তি থাকতে পারে, বিপক্ষ মত আমি পড়ব, জানব, কিন্তু বলতে যাব না। বললে আমার বিশ্বাসের ভিত নষ্ট হয়ে যাবে। এটা হাস্যকর যুক্তি। তাহলে সব বিতার্কিকই ‘ডক্ট বিশ্বাসী’ কিংবা ‘অস্থিরচিত্ত’ হিসেবে সমাজে চিহ্নিত হতেন । তা কিন্তু হচ্ছে না। সমাজে আমরা বর্তমানে নিজস্ব মতধারায় স্থিরবিশ্বাসী এমন প্রদীপ্ত বুদ্ধিজীবীদের সাক্ষ্য পাচ্ছি, যারা অতীতে বিতার্কিক ছিলেন। তাঁদের অনেকেই হয়তো সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী, কিন্তু দ্বন্দ্বের প্রয়োজনে বিতর্ক করেছেন পুঁজিবাদের পক্ষেও। সে সূত্রে পুঁজিবাদ নিয়ে গভীর অধ্যয়ন করতে বাধ্য হয়েছেন, তার ত্রুটিগুলো ধরেছেন, দুর্বলতা ধরেছেন, টের পেয়েছেন ক্ষমতাটাও। এ জন্য আজ পুঁজিবাদকে আক্রমণ করা তার পক্ষে সহজ হচ্ছে। তাই বলে তিনি এ দেশের কিছু রাজনীতিকের মতো ঘন ঘন মত পাল্টাচ্ছেন না।

যিনি ভালো মানুষ এবং একজন ভালো অভিনেতা, তিনি নায়কের চরিত্রের পাশাপাশি খলচরিত্রেও ভালো অভিনয় করেন। তাই বলে তিনি চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যে খলনায়কে পরিণত হন না। বিখ্যাত খলনায়ক হয়েও উৎপল দত্ত একজন অসাধারণ মহানায়ক। প্রত্যেক আইনজীবীই জীবনে অপরাধীদের পক্ষে কমবেশি কথা বলেন, তাই বলে প্রত্যেক আইনজীবীই চোর, ডাকাত, খুনি বা অপরাধী নন। অতএব, বিশ্বাসের বিপক্ষে কথা বললে বিশ্বাসের ভিত্তি ধ্বংস হয় না। যারটা হয় তারটা ভিত্তি নয়, বালির বাঁধ-ওটা দশবার ভাঙবে, ভাঙলেও ক্ষতি নেই।

বিতর্কের জন্যে যেকোনো এক জাতীয় মডেল অনুসরণ করা সৃজনশীলতার পরিপন্থী। এ জন্যে বিভিন্ন মডেল ব্যবহার করে বিতর্ককে একটি আনন্দঘন শিক্ষামূলক শিল্পে পরিণত করা যায়। বিতর্ক থেকে যারা উজ্জ্বল হয়েছেন তাঁরা ব্যক্তিগত নিষ্ঠা, প্রজ্ঞা ও সাধনায় বলীয়ান । পরীক্ষা-নিরীক্ষা, আবর্তন-বিবর্তন ও নানাবিধ সৃজনশীল উদ্ভাবনের মধ্যে বিতর্ক এগিয়ে যাবে—এটাই প্রত্যাশা। বিতর্ক বিশ্বাসের ভিতকে করবে সুদৃঢ়তর।

Leave a Comment