বিতর্কের পরিস্থিতি মডেল

আজকে আমাদের আলোচনার বিষয়ঃ বিতর্কের পরিস্থিতি মডেল

 

বিতর্কের পরিস্থিতি মডেল
বিতর্কের পরিস্থিতি মডেল

বিতর্কের পরিস্থিতি মডেল

বিশ্লেষণাত্মক যুক্তিবাদিতার উত্তরণ

প্রচলিত বিতর্কে সাধারণত এক বাক্যের একটি বিষয়বস্তু থাকে, যা নিয়ে আমরা পক্ষে-বিপক্ষে কথা বলে থাকি। পরিস্থিতি বিতর্কে থাকে কোনো ঘটনার এক অনুচ্ছেদ বর্ণনা বা গল্পাংশ, যার ওপর ভিত্তি করে গ্রহণযোগ্য কল্পনা মিলিয়ে তার্কিকেরা বিষয়টিকে বিশ্লেষণ করবেন এবং নিজের সিদ্ধান্ত প্রতিষ্ঠিত করতে সচেষ্ট হবেন। এখানে বিশ্লেষণক্ষমতা ও যুক্তিবাদিতা একত্রে সত্য প্রতিষ্ঠায় নিয়োজিত থাকে।

বিশ্বখ্যাত টাইটানিক জাহাজ ডুবেছিল ভাসমান বিশাল হৈমশৈলের ধাক্কায়। পরিস্থিতি বিতর্কও ভাসমান হৈমশৈলের মতো, যার মাত্র এক-তৃতীয়াংশ চোখে দেখা যায়, বাকিটা থাকে চোখের আড়ালে সমুদ্রের জলরাশিতে নিমজ্জিত। এ বিতর্কে বর্ণিত পরিস্থিতি সব কথা বলবে না। শুধু দেখাবে হৈমশৈলের ঊর্ধ্বাংশ । গোয়েন্দা কর্মকর্তা পত্রিকায় একটা দুর্ঘটনার কথা পড়েন। তারপর নেমে পড়েন এর শেকড় অনুসন্ধানে । মূল দোষীকে বের করতে হলে তাঁকে বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগ ঘটাতে হয়। গোয়েন্দা কাহিনির মতো বিতার্কিককেও বিশ্লেষণ-দক্ষতা ও যোগসূত্র রচনার কাজটি করতে হবে, যাতে শ্রোতা তার সিদ্ধান্তে উদ্বুদ্ধ হয়।

 

বিতর্কের পরিস্থিতি মডেল 
বিতর্কের পরিস্থিতি মডেল

 

বিতর্কের নিয়মাবলি

১. বিতর্কের পরিস্থিতি মডেলে (Situation Model) বিতর্কের নিয়ন্ত্রণে থাকবেন পরিচালক। জোড় সংখ্যার, যথা ২, ৪, ৬, ৮. বিশেষজ্ঞ থাকবেন বিচারকের আসনে। তাঁরা নাম্বার দেবেন ঠিকই কিন্তু চূড়ান্ত মতামতের জন্য ভোট দেবেন। যদি তাদের ভোট সমানভাবে বণ্টিত হয়। এ ক্ষেত্রে পরিচালক তাঁর চূড়ান্ত ভোটে কোনো পক্ষকে বিজয়ী করবেন। তবে বিচারকগণ যদি তাঁদের টেবিলেই সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন, এ ক্ষেত্রে পরিচালকের ভোট অপ্রয়োজনীয় ।

২. নাম্বারের ভিত্তিতে শ্রেষ্ঠ বক্তা নির্বাচিত হবেন। কোনো দল মোট বেশি নম্বর পেলেও হারতে পারে।

৩. কারও বক্তব্যের সময় মাত্র দুবার আপত্তি উঠতে পারে। তবে পক্ষের ও বিপক্ষের প্রথম বক্তার ক্ষেত্রে তা মাত্র একবার হবে। কারণ তাঁরাই বিশ্লেষণ করে বক্তব্যকে একটা তর্কযোগ্য স্থানে নিয়ে আসেন। তাঁদের বক্তব্যের প্রথম তিন মিনিট কোনো আপত্তি উত্থাপন করা যাবে না।

৪ আপত্তি গৃহীত হবে কি না তা পরিচালক ঠিক করবেন।

৫. প্রত্যেক বক্তা পাঁচ মিনিট করে বলবেন। প্রত্যেক দলপতি দুই মিনিট করে যুক্তিখণ্ডনের অতিরিক্ত সময় পাবেন। ওই সময় নতুন বিশ্লেষণে যাওয়া যাবে না।

৬. বক্তাদের বলা হবে বিশ্লেষক ২, ৩ প্রত্যেক পক্ষেই। বিচারকদের বলা হবে বিশেষজ্ঞ ।

৭. অন্য বিতর্কে বিতর্কের বাক্যটি শ্রোতাদের জানা থাকে। এখানে সে রকম কোনো এক বাক্যের বিষয় নেই বলে পরিচালক সর্বমোট তিনবার পরিস্থিতির লেখাটি পাঠ করবেন নির্মোহভাবে শুরুতে এবং তারপর দুজন করে বলার পরপর।

৮. নম্বরপত্রে বিশ্লেষণ ও যুক্তি একত্রে শতকরা পঞ্চাশ ভাগ নম্বর নেবে। বাকিগুলো প্রথামতো। নমুনা বিচারপত্র হতে পারে উপস্থাপন ও বাচন (১০), সংগত কল্পনাশক্তি (১০), সৃজনশীল বর্ণনা (১০), বিশ্লেষণক্ষমতা ও যুক্তিবাদিতা (৫০), দলগত সমন্বয় (১০), সামগ্রিক ( ১০ ) –এই সর্বমোট ১০০। শেষ দুই মিনিটের নম্বর দশের মধ্যে দেওয়া হবে, যা দল পাবে।

৯. পরিস্থিতি বিতর্কের মঞ্চ বিন্যাস হবে সনাতনী বিতর্ক মঞ্চের বিতর্কের মতোই।

১০ পরিচালক ভোট না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেই তিনি শুধু বিশ্লেষণ ও পক্ষপাতিত্ব দেখাতে পারবেন। তাঁর ভোট দেওয়ার প্রয়োজন হলে তিনি সমাপনী ভাষণে তার প্রতিফলন ঘটাতে পারবেন না।

 

বিতর্কের পরিস্থিতি মডেল
বিতর্কের পরিস্থিতি মডেল

 

পরিস্থিতি তর্কের নমুনা

যেহেতু পরিস্থিতি তর্কের বিষয়বস্তু মানেই সতর্কভাবে রচিত এক একটি নাতিদীর্ঘ অনুচ্ছেদ বা প্যারাগ্রাফ, সেহেতু বেশি বিষয় বা প্রেক্ষিত নিয়ে আলোচনা এই পরিসরে সম্ভব নয়। মাত্র তিনটি পরিস্থিতি এখানে উল্লেখ করে শুধু প্রথমটির কিঞ্চিৎ ব্যাখ্যা দেওয়া হলো।

১. শাস্তি সিদ্ধান্ত:

সঞ্জীব সন্ধ্যায় কলেজের পড়াশোনা শেষ করে বাড়ি ফিরছিল। সাইকেলে। গ্রামের রাস্তায় যেতে যেতে হঠাৎ করে একটি ইটভর্তি ভটভটি (গ্রাম বা মফস্বলে করিমন নসিমন কাঁকড়াজাতীয় বাহন যা কৃষিপণ্যের পরিবহন খাতে যথেষ্ট ব্যবহৃত হচ্ছে) অনেকটা উল্টো দিক থেকে তার সাইকেলকে ধাক্কা দেয়। সজীব প্রাণে বেঁচে গেলেও আহত হয়। ভেঙে যায় তার সাইকেল, যা তার মা স্বাধীনভাবে দরজির কাজ করে উপার্জিত অর্থে কিনে দিয়েছিলেন। গ্রামের চেয়ারম্যানের কাছে সঞ্জীবের মা বিচার দিলে চেয়ারম্যান সন্ধ্যার আগে এভাবে সাইকেল চালাতে নিষেধ করেন। তিনি বলেন, হেঁটে স্কুল করা যায়, হেঁটে তো আর শত শত ইট বহন করা যায় না। সঞ্জীবের মা ক্ষতিপূরণ চাইলে চেয়ারম্যান তাঁকে আলাদা করে অন্য এক সময় দেখা করতে বলেন।

পক্ষ দল মনে করে এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে প্রথমত চেয়ারম্যানের শাস্তি হওয়া উচিত ।

মন্তব্য: পক্ষ দল একটা অবস্থান পরিষ্কার করেছে। এ ক্ষেত্রে বিপক্ষ দলের সুবিধা হলো ওই অবস্থানকে আক্রমণ করা। দুদলই ঘটনার আরও বিশ্লেষণে যাবে ৷ অনেকগুলো বিষয়ে অনুমতির সুযোগ আছে। মহিলা বিধবা নাকি তার স্বামী শহরে বা প্রবাসে কাজ করে বলা যাচ্ছে না। অস্পষ্ট চেয়ারম্যানের প্রবৃত্তি—বিশেষত যখন মহিলাকে আলাদাভাবে দেখা করতে বলেন। ভটভটি-জাতীয় ক্রমবর্ধনশীল বাহনগুলো রাখা বা না রাখা নিয়েও সিদ্ধান্তের ব্যাপার আছে। বিশেষত কৃষিপণ্যের পরিবহন, যাতায়াত, নির্মাণ প্রভৃতি খাতের সহায়ক হিসেবে এদের ভূমিকা কিংবা এগুলো বন্ধ করে আধুনিক বাহন আনা যায় কি না, এ নিয়ে তর্কে উঠে আসবে ।

 

পরিবহন ও যাতায়াত খাতের আইন গ্রাম ও মফস্বল পর্যায়ে যাচ্ছে কি না, নাকি এসব আইনের সুযোগে দুর্নীতি বাড়ছে, সেটাও আসতে পারে। চেয়ারম্যান নাকি অন্য কেউ শাস্তিযোগ্য, সেটি প্রতিষ্ঠিত করবে বিপক্ষ দল। এভাবে পুরো চিত্র না দেখেও চিত্র কল্পনার ক্ষমতা এবং সে কল্পনা বাস্তবানুগ হওয়ার প্রয়োজনীয়তা ফুটে উঠবে এই পরিস্থিতি তর্কে। আরো দুই ধারার দুটো পরিস্থিতি দেওয়া হলো। ঐতিহাসিক বা উপাখ্যানের ঘটনাও পরিস্থিতি তর্কের বিষয় হতে পারে।

২. বীরত্ব যাচাই :

মহাভারতের যুদ্ধে কৌরবপক্ষের প্রথম সেনাপতি ছিলেন মহাবীর ভীষ্ম। পাণ্ডবপক্ষের সেনাপতি মহাবীর অর্জুন—শ্রীকৃষ্ণ যার সারথি ও পরামর্শদাতা। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ প্রথমেই প্রবলাকার ধারণ করে। ভীষ্মের ছিল ইচ্ছামৃত্যু। তাঁকে কোনোভাবেই দমানো যাচ্ছিল না। শ্রীকৃষ্ণের বৃদ্ধিতে অর্জুন তখন তাঁর রথের সামনে শিখণ্ডীকে দাঁড় করান—যাকে দেখলে ভীষ্ম আর যুদ্ধ করেন না । তখন তাঁকে বাণে বাণে জর্জরিত করে ফেলেন অর্জুন । রথ থেকে ভূতলে পড়ে যান ভীষ্ম।

এই পক্ষ মনে করে যে ভীষ্মকে পরাভূত করে অর্জুনের এই বিজয় বীরোচিত হয়নি।

৩. ঔচিত্যের প্রশ্ন :

দীপ্তি সাড়ে সতেরো বছরের মেয়ে, কলেজে পড়ে। মা গৃহবধূ, বাবা চাকুরে, যার মা এখনো বেঁচে আছেন। দীপ্তির দিদিমা সম্প্রতি অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী। তিনি সত্বর দীপ্তির বিয়ে দেখে যেতে চান। মা চান না মেয়ের এখনই বিয়ে হোক, অন্তত বিএ পাসের আগে নয়। বাবা মনের দিক দিয়ে খানিকটা দোদুল্যমানতায় আক্রান্ত। আবার কখনো চান তার মায়ের ইচ্ছে পূরণ করতে। এ নিয়ে সংসারে একটা ঠান্ডা লড়াই চলছে। এই পক্ষ মনে করে যে অন্তত মানবিক কারণে দীপ্তির বিয়ের আয়োজন দ্রুত করা উচিত ।

এ জাতীয় বিতর্কে অনেক তথ্য থাকবে বিক্ষিপ্ত, অপূর্ণ; আবার অনেক তথ্য অপ্রয়োজনীয়। এ জন্য বর্ণনা অনুচ্ছেদ- যাকে আমরা বিষয়বস্তু বলছি- পাওয়ার পর দলগত কৌশল ঠিক করতে হবে, যেন নিজেদের মধ্যে ব্যাখ্যা ও আক্রমণের বৈপরীত্য বা অসংগতি না থাকে। কোনো গল্প ও উপন্যাসের অংশ বা অনুচ্ছেদও এ তর্কের সূত্র হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। এ জাতীয় বিতর্কের চর্চা শুধু দর্শককেই অন্তর্ভুক্ত করবে না। উপরন্তু বক্তার বিশ্লেষণক্ষমতা ও বিচারিক দক্ষতাকে করবে সমৃদ্ধতর ।

Leave a Comment