বিতর্কের চিহ্ন মডেল

আজকের আলোচনার বিষয়ঃ বিতর্কের চিহ্ন মডেল

 

বিতর্কের চিহ্ন মডেল
বিতর্কের চিহ্ন মডেল

 

বিতর্কের চিহ্ন মডেল

চিহ্ন যখন গল্প বলে

নব্বই দশকের শুরুতে ঢাকার একটি কলেজে গিয়ে দেখলাম তার্কিকেরা তাদের চূড়ান্ত বারোয়ারি বিতর্কের বিষয় চাইছে। যেহেতু বারোয়ারি তর্কে নানা দিকে কথা ছড়িয়ে দেওয়ার উপায় আছে, তাই আমি কোনো লম্বা বাক্যভিত্তিক বিষয় না দিয়ে কোনো ইঙ্গিতভিত্তিক সূত্র দেওয়ার চেষ্টা করলাম। মনে হলো শুধুই একটা বিস্ময়বোধক (1) চিহ্ন দেওয়া যায়। বারোজন বক্তা বারোভাবে এই বিস্ময়ের ব্যাখ্যা করেছিলেন। খুব জমেছিল সেই তর্কের আসর। কী এক সৃষ্টিশীলতার আনন্দ বাকশিল্পের উৎসবে।

সত্যিই তো, বিস্ময়ের কি অন্ত আছে? নজরুল বিস্মিত হন অমানবিক ধর্মান্ধতা দেখে, জীবনানন্দ রূপসী বাংলার দর্শনে, রবীন্দ্রনাথ আকাশ ভরা সূর্য তারা আর বিশ্বভরা প্রাণের সান্নিধ্যে। আইনস্টাইনের বিস্ময় ব্রহ্মাণ্ডের অসীমত্বে। আর্কিমিডিস প্লবতার তত্ত্ব আবিষ্কারে আর জগদীশচন্দ্র বৃক্ষেরও প্রাণ আছে—এ কথা ভেবে। বিশ্বব্যাংকের বিস্ময় পূর্ব এশিয়ার অনুপম প্রবৃদ্ধিতে আর বাংলাদেশ। ব্যাংকের বিস্ময় অর্থনীতির উন্নতি সত্ত্বেও খেলাপি ঋণের সম্প্রসারণে।

আমি ইতিমধ্যেই পাঠককে কিছুটা ধারণা দিলাম যে চিহ্নতর্ক কতটা জমজমাট ও শিক্ষাপ্রদ হতে পারে। পরে কোনো একটা শিক্ষালয়ে গিয়ে [2] চিহ্ন অর্থাৎ প্রশ্নবোধক চিহ্ন (interrogative sign) দিলাম। কত প্রশ্নই তো জীবনে আছে। সব প্রশ্নের উত্তরও মেলে না। অর্থনীতির ক্রমহ্রাসমান প্রান্তিক উপযোগ বিধির কথা হচ্ছে কোনো বস্তু যত বেশি পাওয়া যায় এর প্রান্তিক একক থেকে প্রাপ্ত তৃপ্তি ক্রমান্বয়ে কমে আসে। কিন্তু অর্থপ্রাপ্তিতে বহু মানুষের প্রান্তিক উপযোগ কেন বাড়তে থাকে—মাতালের মতো, জুয়াড়ির মতো? এটা একটা বড় প্রশ্ন । উন্নতি কেন বৈষম্য বাড়ায়, এ প্রশ্ন অকিঞ্চিৎকর জমে গেল বিতর্ক।

 

বিতর্কের চিহ্ন মডেল
বিতর্কের চিহ্ন মডেল

 

এবার মনে হলো বিষয়কে আরেকটু বিস্তৃত করা যায়। কারণ বারোয়ারি বিতর্ক এক বিচারে একক, অন্য বিচারে বহুর সম্মিলন । এখানে বিষয়টিকে নিয়ে দক্ষ বক্তার খেলার সুযোগ থাকে—সৃজনশীলতার মাঠে। ঠিক যেমন পেলে, মেসি বা ম্যারাডোনা মাঠে একক ইচ্ছায় অনুশীলন করে যাচ্ছেন। তবে কোচ তো রয়েছেন—ঠিক যেন সভাপতির মতো। খুব বিচ্যুতি হলে তাকে তো হস্তক্ষেপ করতেই হবে। বিষয়টার অঙ্গবৃদ্ধির জন্য এবার একটি বৃত্তের ভেতরে প্রশ্নবোধক চিহ্ন [?]  জুড়ে

দিলাম। বৃত্তের ভেতরে এল বিস্ময়কর [!] চিহ্নও। অর্থাৎ আমাদের প্রশ্ন বা বিস্ময় একটা গণ্ডির ভেতরেই থাকে অথবা আমাদের পারিপার্শ্বিকতার গণ্ডি থেকে আমরা বেরুতে পারি না—কি প্রশ্নে, কি বিস্ময়ের অনুভূতিতে। এখন পর্যালোচনা থেকে যে ধারণা হচ্ছে, সংকেত শুধুই বারোয়ারি তর্কের উপযোগী তা নয়। আসুন এ বৃত্ত আমরা ভাঙি। পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষুদ্রতম দুটো চিঠি চিহ্নের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছিল, কিন্তু বলেছিল অনেক কথা । জর্জ বার্নার্ড শ এক চিঠি লিখলেন তাঁর সদ্য প্রকাশিত গ্রন্থের প্রকাশককে। তাতে ছিল প্রশ্নবোধক চিহ্ন [?]  । প্রকাশক উত্তর দিলেন বিস্ময়বোধক [ ] চিহ্ন দিয়ে অর্থাৎ বইয়ের বিক্রি বিস্ময়কর। অতএব, চিহ্নের অনেক শক্তি।

প্রথাগত নিয়মে দুটো দল বলুক প্রত্যেক পক্ষে তিনজন করে নিয়ে। মাঝে থাকুন নিয়ন্ত্রক কারণ চিহ্নের ব্যাখ্যাদানে অতিরিক্ত বিচ্যুতি ঘটলে নিয়ন্ত্রক তাতে হস্তক্ষেপ করে দুটো দলকেই আবার টেনে স্বাভাবিক ব্যাখ্যার বলয়ে ফিরিয়ে আনতে পারেন। অনেক সময় দলগুলো পরাজয় এড়াতে বা অতিরিক্ত সুবিধা নিতে অতি জটিল বা অশোভন পথে চিহ্নটিকে নিয়ে যেতে পারে। সে জন্যই এ আসরের নিয়ন্ত্রকের খানিকটা বাড়তি দায়িত্ব আছে।

চিহ্ন তর্কের মঞ্চবিন্যাস

এ বিতর্কের মঞ্চবিন্যাস সনাতনী বিতর্কের মতো হলেও এতে কিছুটা বাড়তি সংযোজন আছে। চিহ্নটি বড় করে দেখানোর জন্য একটা প্রদর্শন ধারক বা সাইনবোর্ড থাকবে সবার মাঝে, যেন দর্শকও মনে মনে এ তর্কে ডুবে যেতে পারে। মঞ্চবিন্যাস হতে পারে এরূপ:

বিতর্কের চিহ্ন মডেল
বিতর্কের চিহ্ন মডেল

বর্ধিত বিষয়বস্তু

যেহেতু বিষয়বস্তু নির্দিষ্ট বাক্যে বর্ণিত নয় সেহেতু বক্তাদের সংকেত ব্যাখ্যায় সৃজনশীলতা ও স্বাধীনতার সুযোগ দিতে হবে। ‘স্বপ্নসূত্রে’ এর পেছনের দিকে অনেকগুলো সংকেত তর্কের সূত্র দেওয়া আছে। তবে ইংরেজি ‘Dwandwasutra’-তে চিহ্ন বিতর্কের সূত্রগুলো সংখ্যায় বেশি অর্থাৎ পছন্দের সুযোগ বেশি। ধরা যাক একটি চিহ্ন +/-। এ ক্ষেত্রে পক্ষ যোগ চিহ্নের পক্ষে বলবে আর বিপক্ষ বলবে বিয়োগ চিহ্নের পক্ষে।

পক্ষের বক্তা :

পৃথিবীটা হচ্ছে যোগের খেলা। এখানে একে অন্যের সাথে এক দেশ অন্য দেশের সাথে যুক্ত হচ্ছে। নতুন চিন্তাকে আমরা যোগ করি পুরোনো চিন্তার সাথে বেগবান হয় নবচিন্তা

বিপক্ষের বক্তা :

আসলে নতুন চিন্তা এলে আমরা পুরোনো চিন্তা বিয়োগ করে দিচ্ছি। কবির কথায়, ‘জীর্ণ পুরাতন যাক ভেসে যাক। পুরাতনকে বিয়োগ করা স্বাভাবিক রীতি। আসলে জগতে যোগের চেয়ে বিয়োগ বেশি দৃশ্যমান। আমরা যা পাচ্ছি তার চেয়ে হারাচ্ছি বেশি। হারিয়ে যাচ্ছে বনবাদাড় পরিবেশ নদী প্রকৃতি ও সরল ভালোবাসা। তাই বিয়োগ চিহ্নই জীবনে বেশি প্রবল।

এবার আসা যাক আরেক বিষয়বস্তুর কথায়। এর মানে হচ্ছে পক্ষ বিষাদময় জীবনের চিত্র তুলে ধরবে। এ প্রসঙ্গে তারা বিধান ও দুঃখবাদী সাহিত্যের সমাবেশ করবে। পৃথিবীর বড় বড় মহাকাব্য বিশেষত মহাভারত বা ইলিয়াড-এর শেষে বিজয় দেখা গেলেও এর গভীরে ছিল দুঃখময়তা। পক্ষান্তরে বিপক্ষ জগতে আনন্দযজ্ঞের বার্তা ফুটিয়ে তুলবে। সবকিছুর গভীরে আনন্দের আধিক্য না থাকলে মানুষ বেঁচে থাকত না— আত্মহননের পথ বেছে নিত। বিষাদের চেয়ে আনন্দ বেশি বলেই স্বাধীনতাযুদ্ধে এত কিছু হারানোর পরও আমরা আবার যাত্রা শুরু করেছিলাম।

এভাবে [>/</ চিহ্ন তর্কের হবে ‘বৃহত্তর’ বনাম ‘ক্ষুদ্রতর’ ভাবদ্বয়ের মধ্যে। পক্ষ বোঝাতে চাইবে যে জগতে বৃহত্তর চিন্তাই জয়ী হয়। বিপক্ষ বলবে এর উল্টো। কিংবা কৌশল পাল্টে বলবে, হ্যাঁ, বৃহত্তর চিন্তার জয় সত্যি। কিন্তু সব বৃহত্তর চিন্তা প্রথমে ক্ষুদ্রতর চিন্তার সিঁড়ি বেয়ে যাত্রা শুরু করে। তাই ক্ষুদ্রতর চিন্তাই অধিক ধন্যবাদযোগ্য।

 

সমাপনী

সব ক্ষেত্রেই যে দুটো চিহ্ন থাকতে হবে এমন কথা নেই। একটি চিহ্নের ওপর বক্তা পক্ষে বলা শুরু করতেই প্রতিচিন্তা সহজেই এসে যায়। যেমন শুধু যোগ চিহ্ন, শুধু বিষাদ বদন, কিংবা বৃহত্তর চিহ্ন। একটা হৃদয়ের চিহ্ন বিষয় হলে প্রথম বক্তা হৃদয়বাদিতা বা প্রেম নিয়ে কথা বলবে—বলবে প্রেমের জয় সর্বত্র। কিন্তু বিপক্ষ আঁকবে বিপরীত চিত্র। এভাবে চিহ্ন বিতর্ক বা বিতর্কের চিহ্ন মডেল (Sign Model) শুধু চিন্তার খোরাকই দেবে না, উপরন্তু যুক্ত করবে সৃজনশীলতায় যুক্তিবাদিতার আনন্দ। এ জাতীয় সংকেত বিতর্কচর্চায় উপভোগ্য ও শিক্ষণীয় এক নিরীক্ষা মডেল।

Leave a Comment