বিতর্কের পুঞ্জ মডেল

আজকের আলোচনার বিষয়ঃ বিতর্কের পুঞ্জ মডেল

 

বিতর্কের পুঞ্জ মডেল
বিতর্কের পুঞ্জ মডেল

 

বিতর্কের পুঞ্জ মডেল

খণ্ডন-প্রধান তর্কপদ্ধতি

বিতর্ক যুক্তিবোধের শাস্ত্র। বিতর্ক উদ্বুদ্ধকরণের বিদ্যা। যেকোনো শিল্পকে সমৃদ্ধ করতে হলে তার জন্য চাই গবেষণা ও অধ্যয়ন। এই ক্রমাগত চর্চা, কর্মশালা, গবেষণা ও নিরীক্ষা থেকেই বেরিয়ে আসবে একটা শাস্ত্রীয় দিকনির্দেশনা। অনেকেই প্রশ্ন করেছেন, বিতর্ক কি একটি শাস্ত্র হতে পারে? কেন পারে না। তর্কশাস্ত্র কি বিতর্কশাস্ত্রের অন্তর্ভুক্ত নয়? বিতর্ক নতুন কোনো শাস্ত্র নয়, এক অতি প্রাচীন বিদ্যা।

প্রাচীন গ্রিক সভ্যতায় বিতর্ক এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ডেমস্থেনিস বিতর্কশাস্ত্রের জনক। কথায় আছে, দার্শনিক সিসেরো যখন ভাষণ দিতেন তখন লোকেরা একে অন্যের দিকে তাকিয়ে বলত, ‘চমৎকার বক্তৃতা। কিন্তু ডেমস্থেনিস যখন ভাষণ দিতেন তখন লোকেরা তাৎক্ষণিকভাবে উদ্বুদ্ধ হয়ে বলত, ‘চলো এগিয়ে যাই।’ অর্থাৎ যেদিকে তিনি এগিয়ে যাওয়ার ডাক দিলেন সেদিকেই।

 

বিতর্কের পুঞ্জ মডেল
বিতর্কের পুঞ্জ মডেল

 

গ্রিক দার্শনিক সক্রেটিস বিতর্ক তথা এই উদ্বুদ্ধকরণের শিল্পাশ্রয়েই যুবসমাজকে নৈতিকতা ও আত্মবোধে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। যুগশ্রেষ্ঠ বিতার্কিক বলেই তাঁকে ভয় পেয়েছিল গ্রিসের রক্ষণশীল সম্প্রদায়। এমনকি বিতার্কিক বলেই তিনি সমাজ বিশ্লেষণে পিছিয়ে গেলেন না। ধারণ করলেন হেমলকের মরণপাত্র। তবে সেই গ্রিক সভ্যতার বিতর্কশাস্ত্র যুগের আবর্তে পরিশীলিত হয়েছে, উন্নত হয়েছে, সৃষ্টি হয়েছে অনেক পদ্ধতি। যেমন ১ সনাতনী, ২. সংসদীয়, ৩. জাতিসংঘ ইত্যাদি ।

আমাদের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সনাতনী বিতর্কধারা চালু রয়েছে। এ ধারার বিতর্কে উভয় পক্ষের তিনজন করে বক্তা থাকেন এবং তাঁরা বিপরীত ধারাক্রমে প্রত্যেকে পাঁচ মিনিট করে বক্তব্য দেন। আলোচ্য বিতর্কের পুঞ্জ মডেল (Cluster Model) সনাতনী পদ্ধতির ওপরই এক অভিনব নিরীক্ষা। এই পদ্ধতি সনাতনী পদ্ধতির ওপর এক কৌশলগত উন্নয়ন। প্রথমে আমি মডেলটি ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করি।

ধরা যাক, কোনো বিষয়, ‘তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ সমাগত’। এ বিষয়ের পক্ষের বক্তারা হলেন X, Y ও Z । বিপক্ষের বক্তারা হলেন A, B ও C । প্রচলিত ধারায় প্রত্যেকে পাঁচ মিনিট করে বক্তব্য দিয়ে আসন গ্রহণ করেন। বিতার্কিকদের অবস্থান ও বক্তব্যের ধারাক্রম সঞ্চালনপথের মাধ্যমে দেখানো যায় এভাবে

 

বিতর্কের পুঞ্জ মডেল
বিতর্কের পুঞ্জ মডেল

 

গভীরভাবে তলিয়ে দেখলে কয়েকটি ত্রুটি চোখে পড়ে। যুক্তি বিতর্কের প্রাণ, আর যুক্তিখণ্ডন বিতর্কের শ্রেষ্ঠ দক্ষতা। অথচ

ক) প্রথম বক্তা যুক্তিখণ্ডনে প্রত্যক্ষভাবে উপাদান পান না।

খ) দ্বিতীয় বক্তা এবং সর্বোপরি দলপতির ওপর ক্রমবর্ধমান হারে যুক্তিখণ্ডনের দায়িত্ব অর্পিত হয় ।

গ) পক্ষের দলপতিকে বিপক্ষের দলপতি খণ্ডন করার সুযোগ পান; কিন্তু বিপক্ষের দলপতি শেষ বক্তা হওয়ায় তাঁকে খণ্ডন করতে পারেন না পক্ষের দলপতি।

ঘ) পক্ষের দল দুভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রথমত, পক্ষের প্রথম বক্তা যুক্তিখণ্ডনে প্রত্যক্ষভাবে উপাদান পান না। দ্বিতীয়ত, পক্ষের দলপতি বিপক্ষের দলপতির চেয়ে কম নিরাপদ অবস্থানে থাকেন। এমনকি বিপক্ষের দলপতি অসার যুক্তি প্রদান করলেও এবং পক্ষের দলপতির মনে চরম উত্তর ঘুরপাক খেলেও তিনি তা মঞ্চে প্রকাশ করতে পারেন না।

এ অবস্থাকে কিছুটা প্রশমিত করার জন্য টেলিভিশনে আরেকটি পদ্ধতি চালানো হয়। সেটা হলো, উভয় পক্ষের দলপতির জন্য অতিরিক্ত দুই মিনিট করে যুক্তিখণ্ডনের সুযোগ প্রদান। এটা অনুষ্ঠানকে বরাবরের মতো টেনে লম্বা করা ছাড়া আর কিছুই নয়। কারণ, ধারা একই হয়ে গেল। সামান্য পরিমাণগত পরিবর্তন কোনো গুণগত পরিবর্তন ঘটাল না।

যুক্তিখণ্ডনের অধিকারও বিশেষায়িত করা হলো, কেন্দ্রীভূত করা হলো, কুক্ষিগত করা হলো শুধু দলপতিদের জন্য । প্রথম বক্তা বা মধ্যম বক্তার যুক্তিবোধ তার চেয়েও শাণিত হলেও আমরা তা বোঝার সুযোগ পেলাম না। বিপক্ষের দলপতি আবারও শেষ বক্তা। পদ্ধতিটি অবশেষে উপযোগিতা হারিয়ে পরিত্যক্ত হলো।

(ঙ) টানা পাঁচ মিনিটের বক্তৃতা বক্তাদের মুখস্থশক্তির ওপর নির্ভরতা বাড়ায় । বিতর্কের দর্শক-শ্রোতা দীর্ঘস্থায়ী বক্তৃতা শুনতে চায় না, সেটা বিভিন্ন রাজনৈতিক সভা-সেমিনারেই শোনা যায়। তার চেয়ে তারা স্বল্পস্থায়ী হলেও, শুনতে চায় যুক্তি। মুখস্থশক্তির ওপর নির্ভরতা তাৎক্ষণিক যুক্তি উপস্থাপন বা খণ্ডনে সহায়তা করে না, বরং শক্তিক্ষয় ঘটায়।

 

বিতর্কের পুঞ্জ মডেল
বিতর্কের পুঞ্জ মডেল

 

এই ত্রুটিগুলো দূর করে বিতর্ককে আরও অর্থবহ, যুক্তিপ্রধান, সর্বব্যাপ্ত, অংশগ্রহণমূলক, সর্বজনীন অধিকারমূলক এবং সর্বোপরি আকর্ষণীয় করে তোলার লক্ষ্যেই প্রণীত হয়েছে বিতর্কের পুঞ্জ ধরন। এ বিতর্কের নিয়মাবলি বা সুবিধাবলি নিম্নরূপ

বিতর্কের নিয়মাবলি বা সুবিধাবলি

১. প্রত্যেকে একাধিকবার বিতর্কে অবতীর্ণ হবেন ।

২. প্রত্যেকে প্রতিবার দুই মিনিট করে বলবেন। মোট তিনবার সুযোগ পাবেন এবং সর্বমোট (২+২+২) ৬ মিনিট বলবেন। কেবল প্রথম বক্তা (X) মোট (২+২+২+২) ৮ মিনিট বলবেন ।

৩. প্রত্যেকেই প্রত্যেককে খণ্ডন করার বা জবাব দেওয়ার সুযোগ ও সময় পাবেন।

৪. সভাপতি শুধু বিতর্ক শুরু করে দেবেন এবং ১৯তম বক্তার পর, অর্থাৎ (২×১৯) ৩৮ মিনিট পর বিতর্কের সমাপ্তি ঘোষণা করবেন ।

৫. বর্ণিত বৈচিত্র্যময় ধারাক্রম অনুযায়ী এক বক্তার পর আরেক বক্তা আলাদা মঞ্চে না গিয়ে সংসদের মতো নিজের স্থানে দাঁড়িয়ে যুক্তিখণ্ডন ও বক্তব্য প্রদান করে যাবেন।

পুঞ্জ বিতর্কের ধারাক্রম ও সঞ্চালনপথ নিচের মডেলে ব্যাখ্যা করা হলো

পক্ষের দল X, Y, Z এবং দলপতি Z
বিপক্ষের দল A, B, C এবং দলপতি C

তারা উল্টো V ধাঁচে মুখোমুখি বসবেন। মোট চার রাউন্ডের (পর্যায়ের) বিতর্ক হবে, তবে বিরামহীনভাবে। নিচের মডেলে তা দেখতে পাই

 

বিতর্কের পুঞ্জ মডেল
বিতর্কের পুঞ্জ মডেল

 

বিতর্কের পুঞ্জ মডেলের বিকাশপথ

বক্তব্যের ধারাক্রম অনুযায়ী বিতার্কিকদের অবস্থান তারকাপুঞ্জের মতো। ১৯টি বক্তব্যের পুঞ্জীভূত রূপ ৬ জন তার্কিক এবং একটি পুঞ্জীভূত সিদ্ধান্ত, যা বিষয় থেকে লভ্য । এসব দৃষ্টিভঙ্গি থেকে মূলত কাব্যিকতার দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই এ ধাঁচ বা মডেলের বিতর্কের নাম পুঞ্জ বিতর্ক। বৃন্দ আবৃত্তির মতোই এ এক আনন্দপ্রদ ও অধিক ফলোৎপাদক নিরীক্ষা।

কী কী কারণে পুঞ্জ বিতর্ক সনাতনী বিতর্কের চেয়ে অধিক ফলোৎপাদক, তা আমরা ব্যাখ্যা করতে পারি।

প্রচলিত বিতর্ক ধাঁচ এ মডেলের ১ম পর্যায়েই এসে গেছে। যেখানে AY-কে Y B-কে B Z-কে এবং Z C-কে খণ্ডন করতে পারছেন না। X কাউকেই খণ্ডাতে পারছেন না। এ অপূর্ণতাগুলো উভয় দিক দিয়েই পূর্ণ হয়ে যায় এ মডেলে

১ম পর্যায়ে X-এর দুর্বলতা A ধরতে পারেন। X-এরও ইচ্ছা ও ক্ষমতা থাকতে পারে A-কে জবাব দেওয়ার। সে সুযোগ X পাচ্ছেন ২য় ও ৩য় পর্যায়ের সমাপ্তি পর্বে। আবার প্রথম পর্যায়ে A-কে Y খণ্ডন করলেন। Y-কে A খণ্ডন করে মনের সাধ মেটালেন ৩য় পর্যায়ে। এভাবে প্রত্যেকে প্রত্যেককে পাল্টাপাল্টিভাবে ঘায়েল করতে পারেন। তাতে ধারাক্রমটি দাঁড়ায় এ রকম

X-কে B তাৎক্ষণিকভাবে খণ্ডন করেন ২য় পর্যায়ে। কিন্তু কোথাও B-কে X তাৎক্ষণিকভাবে খণ্ডন করার ক্ষেত্র পান না। সে জন্য একটি অতিরিক্ত ৪র্থ পর্যায় সৃষ্টি করে X-কে সে অধিকার দেওয়া হয়েছে, যেখানে তিনি B-কে খণ্ডন করেন এবং বিতর্ক সমাপ্ত করেন। এভাবে উদ্বোধনী বক্তাকে যুক্তিখণ্ডনের নম্বর দেওয়াতে যে কূটতর্ক প্রচলিত ছিল, তারও অবসান ঘটানো সম্ভব। এ মডেল প্রচলিত হলে উদ্বোধনী বক্তা হিসেবে বক্তৃতা শুরু করতে কেউই দ্বিধান্বিত হবেন না, যা তারা হন প্রচলিত ধারার বিতর্কে।

সহজ কথায় পুঞ্জ বিতর্কে বক্তাদের ধারাক্রম হবে

১ম পর্যায় X →A→Y→B→Z→C

২য় পর্যায় X→B→Y→C→Z→A

৩য় পর্যায় X →C→Y→A→Z→B

৪র্থ পর্যায় X

 

প্রচলিত ধারার ওপর পুঞ্জ বিতর্কের উৎকর্ষ

১. প্রত্যেককে প্রত্যেকে খণ্ডন করার অধিকার ও সুযোগ পান। সুযোগ ও ন্যায্যতার দৃষ্টিতে এটা একটা সর্বব্যাপ্ত ও সুষম বিতর্ক।

২. একবারে সবটুকু বলে দেওয়ার চেয়ে প্রত্যেক বক্তা তিনবার বলার সময় পাচ্ছেন। বিতর্কের গতিপ্রকৃতি দেখে তিনি বুদ্ধির সঙ্গে তাঁর আক্রমণের ক্ষেত্র ও কৌশল পাল্টাতে পারেন।

৩. বিতার্কিকেরা জড়তামুক্ত হন এবং বিতর্ক হয়ে ওঠে খুবই আকর্ষণীয় ও অংশগ্রহণমূলক ।

৪. প্রচলিত বিতর্কের চেয়ে এখানে গুণক ও ত্বরক প্রভাব বেশি।

৫. মুখস্থ বিতর্কের ওপর নির্ভরতা হ্রাস পায়। বিতার্কিক বিপক্ষের যুক্তিকে তাৎক্ষণিকভাবে পুঁজি করে তাকে যেভাবে ইচ্ছা জবাব দিতে পারেন। তাৎক্ষণিক শৈলীর বিতর্কে এ মডেল আকর্ষণীয় ও যথেষ্ট ফলোৎপাদক।

৬. মাঝে কোথাও সভাপতি বা উপস্থাপকের অংশগ্রহণ না থাকায় বিতর্কের মেজাজে এক অব্যাহত ধারা বজায় থাকে এবং সাহিত্যের দৃষ্টিভঙ্গিতে এ তর্কযুদ্ধে সৃষ্টি হয় যুক্তি ও চিন্তার এক ক্রম-উন্নত অব্যাহত ধারা ।

সমাপনী

প্রশংসা করে কোনো নতুন মডেল প্রতিষ্ঠিত করা যায় না। এর উৎকর্ষ বা ত্রুটিগুলো আরও ধরা পড়বে এর প্রয়োগের ওপর। শিক্ষার্থী বিতার্কিকেরা নিরীক্ষামূলক পদক্ষেপ হিসেবে এর পুঞ্জ মডেল প্রয়োগ করবেন এবং নতুন প্রাপ্তি ও সমালোচনার নবদ্বার উন্মোচন করবেন-এটাই আমার প্রত্যাশা। তখনই প্রমাণিত হবে, বিতর্ক কোনো জলাবদ্ধতার বিষয় নয়, বরং তা হচ্ছে ক্রমবিকাশমান সৃজনশীল এক শিল্প-স্থিতিস্থাপক ও গ্রহণশীল এক শাস্ত্র। নন্দনতাত্ত্বিক ও সমাজতাত্ত্বিক—উভয় দিকেই বিতর্ক পালন করছে এক সব্যসাচীর ভূমিকা। পুঞ্জ বিতর্ক—তারকাপুঞ্জের মতো সন্নিবেশিত করবে মেধা, যুক্তি ও উজ্জ্বলাকে—এ আমার বিশ্বাস।

Leave a Comment