আজকে আমাদের আলোচনার বিষয়ঃ বিতর্কের প্রধান তিন ধারা

বিতর্কের প্রধান তিন ধারা
বিতর্ক একটি শাস্ত্র, একটি শিল্প। বিশ্বের শক্তিশালী শিল্পগুলোর অন্যতম। মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে তিন দফা বিতর্ক তার প্রমাণ। ১৯৯২ সালে শেষ বিতর্কে মোকাবিলা করার আগে স্বয়ং প্রেসিডেন্ট বুশ হোয়াইট হাউস থেকে ছুটি নিয়ে বিতর্কশাস্ত্র-বিষয়ক গ্রন্থ ঘাঁটাঘাঁটি করেছেন। এ থেকেই বোঝা যায়, উন্নত বিশ্বে বিতর্ক কোন পর্যায় গিয়ে পৌঁছেছে। সেখানে একজন ভালো বিতার্কিক বা বিশেষজ্ঞকে উচ্চ সম্মানী দিয়ে নিয়োগ করা হয় নির্বাচনী বক্তৃতাগুলো যাতে আরও যুক্তিযুক্ত ও জোরালো হয়, সে ব্যাপারে সহায়তা করার জন্য।
বিতার্কিকেরা সাংসদ বা সিনেটরদের উপদেষ্টা হিসেবেও কাজ করে থাকেন । দক্ষ তার্কিককে বড় বড় পত্রিকা বা প্রতিষ্ঠানে রাখা হয় তাঁদের মতাদর্শ বা চেতনায় জনগণকে উদ্বুদ্ধ ও অনুপ্রাণিত করার কঠিন দায়িত্ব পালনের লক্ষ্যে। অথচ আমাদের দেশে বিতর্ক নিয়ে এ ধরনের পরিকল্পনা করলে অনেকে হাসবেন, ব্যাপারটিকে অনেকে করুণার দৃষ্টিতে দেখবেন।
তবু বিতার্কিকেরা হতাশ হন না। এ গুণ তাঁদের স্বভাবজাত। নিরাশ মানুষ বিতর্ক করতে পারেন না। এ দেশেও আমরা বিতর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী বিতর্ক অচিরেই বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে একটি শাস্ত্রের মর্যাদা নিয়ে আবির্ভূত হবে। ক্রমান্বয়ে সমাজ বিতর্ক থেকে শিক্ষা নেওয়া শুরু করবে, এ থেকে সুফল পাবে। বৃদ্ধি পাবে এর কদর এবং আস্তে আস্তে এর পেশাগত দিকগুলো উন্মোচিত হবে।
সরকারি দলের উপনেতা এবং বিরোধীদলীয় নেত্রী নব্বইয়ের দশকের শুরুতে এক পত্রিকায় সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, আমাদের দেশেও নির্বাচন-পূর্ব বিতর্ক আয়োজন করা যেতে পারে। সরকারি ও বিরোধী দল যদি একত্রে এ রকম সভা ও প্রত্যক্ষ প্রতিযোগিতামূলক বিতর্কের ব্যাপারে আন্তরিক ও উদ্যোগী হয়, তাহলে নির্বাচনে মূর্খ, মাস্তান, পাজেরো, পেশি এবং কালোটাকার দাপট কমবে। যোগ্য, বুদ্ধিমান ও যুক্তিবোধসম্পন্ন ব্যক্তিরা নির্বাচনে নামার সাহস পাবেন। তাঁরা জনপ্রতিনিধি হলে সমাজেরও মঙ্গল হবে।
যুক্তরাষ্ট্রসহ উন্নত দেশে ভালো বিতর্ক জানলে একজন প্রার্থী মাত্র দেড় ঘণ্টায় লাখ লাখ ভোট নিজের পক্ষে টেনে আনতে পারেন। আমাদের সমাজেও আস্তে আস্তে বিতর্কের কদর বাড়বে, কারণ সভ্যতার চাকা পেছন দিকে ঘুরবে না। শিক্ষাবৃদ্ধি, চেতনা ও দৃষ্টিভঙ্গির প্রসারে বিতর্কের আবেদন বৃদ্ধি করা সম্ভব। কিন্তু এর সঙ্গে অপরিহার্য কাজ হচ্ছে
১. বিতর্ককে প্রয়োজনীয় এবং জনপ্রিয় করে তোলা।
২. বিতর্কের একটি শাস্ত্রীয় ভিত তৈরি করা।
৩. রাষ্ট্রীয়ভাবে বিতর্কের সাংগঠনিক তৎপরতা জোরদার করা।
এবারে আমরা বিতর্কের একটি দিক, অর্থাৎ শাস্ত্রীয় ভিত্তি এবং আরও বিশেষভাবে বিতর্কের শ্রেণিবিভাগ নিয়ে আলোচনা করব। প্রচলিত সমস্ত বিতর্ককে মূলত তিনটি ধারায় বিভক্ত করা যায়। এই শ্রেণিবিভাগ কোনো বেদবাক্য নয়। এটি আমার দৃষ্টিভঙ্গিজাত। তবে অন্য যেকোনো শ্রেণিবিভাগই করা হোক না কেন, তাতে আলোচ্য উপাদানগুলো অবশ্যই থাকতে হবে।

বিতর্কের ধারা
প্রথমত, বিতর্কের ধারা তিনটি হচ্ছে
১. প্রত্যক্ষ ধারা
২. পরোক্ষ বা প্রতীকী ধারা এবং
৩. উন্মুক্ত বা বিবিধ ধারা
১. প্রত্যক্ষ ধারাঃ
প্রত্যক্ষ তার্কিক হয়ে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হওয়ার নামই প্রত্যক্ষ ধারা। এ ধারার অন্তর্ভুক্ত উপাদানগুলো হলো
ক) দ্বিমুখী বিতর্ক সনাতনী বা প্রচলিত ধারা
খ) বহুমুখী বিতর্ক
গ) পুঞ্জ বিতর্ক
ঘ) বহু বিতর্ক
ঙ) রম্য বিতর্ক ইত্যাদি

২. পরোক্ষ বা প্রতীকী ধারাঃ
পরোক্ষ বা প্রতীকী পরিচয়ের আড়ালে বিতর্কে লিপ্ত হওয়ার নাম পরোক্ষ বা প্রতীকী ধারা। বাস্তব বিতর্ক মঞ্চগুলোর অনুকরণে এখানে শাস্ত্রবদ্ধ বিতর্কের প্রয়াস চালানো হয়। এ ধারার উপাদানগুলো হলো
ক) সংসদীয় পদ্ধতির বিতর্ক
খ) জাতিসংঘ পদ্ধতির বিতর্ক
গ) প্রাক-নির্বাচন পদ্ধতি বিতর্ক
ঘ) আদালত পদ্ধতির বিতর্ক
ঙ) কংগ্রেস পদ্ধতির বিতর্ক ইত্যাদি।

৩. উন্মুক্ত বা বিবিধ ধারাঃ
প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ধারা ছাড়া অন্য সব ধরনের বিতর্ককে এ ধারায় অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব। এ ধারার অন্তর্ভুক্ত উপাদানের সংখ্যা বেশ কয়েক রকমের হতে পারে। এর মধ্যে ব্যবহারিক দিকে লক্ষ রেখে আমরা কয়েকটি ধরনের উল্লেখ করতে পারিঃ
ক) বারোয়ারি বিতর্ক
খ) মুক্ত আলোচনা
গ) কাব্য বিতর্ক
ঘ) মুক বিতর্ক
ঙ) ভৌতিক বিতর্ক ইত্যাদি ।
নিচের ছকের মাধ্যমে আমরা বিষয়টি আরও পরিষ্কার করতে পারি।

১.ক) দ্বিমুখী বিতর্কঃ
দুটি দল প্রত্যক্ষভাবে মুখোমুখি দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়। দুই দলেরই দলপতি বা দলনেত্রী থাকেন। সাধারণত প্রতি দলে দুই থেকে চারজন বক্তা থাকেন। টেলিভিশনের প্রচলিত বিতর্ক এ ধারার বলে এর সঙ্গে সবাই পরিচিত, যার বিতর্কক্রম নিম্নরূপ
পক্ষ
অ (উদ্বোধনী বক্তা)
আ (মধ্যম বক্তা)
ই (দলপতি বা দলনেত্রী)
বিপক্ষ
ক (প্রথম বক্তা)
খ (মধ্যম বক্তা)
গ (দলপতি বা দল)
১.খ) বহুমুখী বিতর্ক :
দুইয়ের বেশি দল এ বিতর্কে লিপ্ত হয়। তবে প্রতিটি দলই অপর যেকোনো এক বা একাধিক দলকে খণ্ডন করতে পারে, পারে বিরুদ্ধাচরণ করতে। ত্রিমাত্রিক বিতর্ক বহুমুখী বিতর্কের অন্তর্ভুক্ত। ধরা যাক, একটি বিষয় ‘বেকারত্ব নয়, নিরক্ষরতা আমাদের অগ্রগতির প্রধান অন্তরায়’। একদল বলবে বেকারত্বের পক্ষে কথা, আরেক দল বলবে নিরক্ষরতার পক্ষে কথা। কিন্তু তৃতীয় দলটি এই দুই পক্ষকেই অস্বীকার করে হয়তো বলবে সামাজিক অবকাঠামোর কথা।
১.গ) পুঞ্জ বিতর্কঃ
এ পদ্ধতির বিতর্ক নব্বইয়ের দশকের শুরুতে আসা একটি নিরীক্ষা। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্বল্পবিস্তর এর প্রয়োগ হয়েছে। এটি প্রত্যেকেই প্রত্যেককে খণ্ডন করা এবং প্রত্যেকে একাধিকবার সুযোগ পাওয়ার পদ্ধতিসম্পন্ন বিতর্ক মডেল।
১.ঘ) বজ্র বিতর্কঃ
মঞ্চে বসার পর বজ্রপাতের মতো বিষয়বস্তু নিয়ে বিতর্ক করাকে বজ্র বিতর্ক বলে। এতে এক অধিবেশনে দুই পক্ষ প্রদত্ত দুটো বিষয়ে বিতর্ক হয়।
১.ঙ) রম্য বিতর্কঃ
হাস্যরসাত্মক বিতর্ক, যা প্রতিযোগিতার পরিবর্তে প্রীতিবর্ধনে ব্যবহৃত হয়।
দ্বিতীয় ধারার বিতর্ক পদ্ধতি
২.ক) সংসদীয় পদ্ধতির বিতর্ক :
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সংসদের একটি প্রতীকী উপস্থাপনার নাম সংসদীয় পদ্ধতির বিতর্ক। যুক্তিতর্ক’ নামক অনুষ্ঠানটি বিটিভির ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সংসদীয় বিতর্ক পদ্ধতি চালু করে। যেখানে সংসদের মতো স্পিকার বিতর্কটি পরিচালনা করেন। থাকে সংসদের মতোই সরকারি ও বিরোধী দল। এখন এটি একটি জনপ্রিয় মডেল ।
২. খ) জাতিসংঘ পদ্ধতির বিতর্ক :
জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনের শৈলীতে প্রতীকী উপস্থাপনায় এ বিতর্ক করা হয়। এক-একজন বক্তা এক-একটি দেশকে উপস্থাপিত করেন। মূলত আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও অর্থনীতিবিষয়ক বিতর্কে এ পদ্ধতি ফলপ্রদ ও আকর্ষণীয়।
২.গ) প্রাক্-নির্বাচনী পদ্ধতির বিতর্কঃ
প্রতিবার রাষ্ট্রপতি বাছাইয়ের আগে যুক্তরাষ্ট্র যে প্রাক-নির্বাচনী বিতর্ক আমরা সিএনএনের মাধ্যমে উপভোগ করি, এরও একটি প্রতীকী উপস্থাপনা আমরা বিতর্কে আনতে পারি। জাতীয়, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিষয়াবলি নিয়ে এক-এক বক্তা এক-একটি রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব দেবেন, যেখানে প্রশ্নকর্তা থাকবেন সাংবাদিক বা বুদ্ধিজীবীরা। এ পদ্ধতি প্রয়োগ করে আমরা রাজনৈতিক নেতাদের সহনশীল গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া চর্চায় অভ্যস্ত করতে পারি।

২.ঘ) আদালত মডেল বিতর্কঃ
বিচারালয়ের ধাঁচে বিতর্ক মডেল। অন্য যেকোনো বিতর্কের প্রতীকী উপস্থাপনা এ পর্যায়ে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
২.ঙ) কংগ্রেস পদ্ধতির বিতর্কঃ
যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের দ্বিস্তরীয় আইনসভা তথা সিনেট ও হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস-এ প্রচলিত বিতর্ক মডেলের আদলে গড়া তর্কের আসরকে এক কথায় বিতর্কের কংগ্রেস মডেল বলা যায়।
তৃতীয় ধারার বিতর্ক পদ্ধতি
৩.ক) বারোয়ারি বিতর্ক:
এটি নির্দিষ্ট অথচ প্রশস্ত গণ্ডিসম্পন্ন বহুমুখী বিতর্ক। শুধু শ্রেষ্ঠ বক্তাদের নিয়ে এ বিতর্ক হয়। তবে একে মুক্ত বিতর্ক বলা শ্রেয়। বহুমুখী ধারার সঙ্গে এর পার্থক্য হলো, এখানে কোনো বক্তা অপর বক্তাকে আক্রমণ করতে দায়বদ্ধ বা বাধ্য নন। দেশ এখন চায় একজন যোগ্য নেতা’-বারোয়ারি বিতর্কে এ ধরনের বিষয়ে আক্রমণের চেয়ে আপন যুক্তি স্থাপন বেশি জরুরি।
৩.খ) মুক্ত আলোচনাঃ
কোনো সেমিনারে নির্দিষ্ট মূল প্রবন্ধ পাঠের পর মুক্ত আলোচনার সুযোগ দেওয়া হয়, যাকে উন্মুক্ত বিতর্ক হিসেবে আখ্যায়িত করা যায়। এ বিতর্ক যথেষ্ট শৃঙ্খলমুক্ত।
৩.গ) কাব্য বিতর্ক :
কবিতার ছন্দে, সুরে, দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়ে কাব্য বিতর্ক সৃষ্টি করা যায় । গ্রামের কবির লড়াই এর অন্তর্ভুক্ত।
৩.ঘ) মূক বিতর্ক:
কথা না বলে অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে প্রতিবাদ বা দ্বন্দ্বে লিপ্ত হলে মূক বিতর্কের সৃষ্টি হয়।
৩.ঙ) ভৌতিক বিতর্কঃ
বিভিন্ন বক্তার মধ্যে বিভিন্ন প্রয়াত ব্যক্তিত্বের ভৌতিক আগমন কল্পনা করে এ বিতর্ক করা সম্ভব। প্রতীকী হলেও এর নীতিমালা যথেষ্ট শিথিল।
মূক ও ভৌতিক বিতর্ক এখনো আমাদের কাছে পরিচিত নয়। শিথিল নীতিমালাসম্পন্ন বা ক্ষেত্রবিশেষে শৃঙ্খলহীন বিতর্কের ধরন এ ধারায় অন্তর্ভুক্ত হতে পারে এবং হতে থাকবে।
পদ্ধতির বৈচিত্র্য এনে যদি পরীক্ষামূলকভাবে তার্কিকেরা এগুলো প্রয়োগ করেন, তাহলে বিতর্ক হবে আরও আকর্ষণীয়, জনপ্রিয় এবং সত্যিকার অর্থেই ফলোৎপাদক। অন্য শিল্পের কথা জানি না, তবে বিতর্ক জীবনকে কখনো নিরাশ করে না, চর্চাকারীকে কখনো শূন্য হাতে ফিরিয়ে দেয় না। প্রতিদান বিতর্কের অক্ষয় বরপুত্র।
