বিতর্ক প্রস্তুতির ষড়ভুজ মডেল

আজকের আলোচনার বিষয়ঃ বিতর্ক প্রস্তুতির ষড়ভুজ মডেল

 

বিতর্ক প্রস্তুতির ষড়ভুজ মডেল
বিতর্ক প্রস্তুতির ষড়ভুজ মডেল

 

বিতর্ক প্রস্তুতির ষড়ভুজ মডেল

বিতর্কের প্রস্তুতি নিলে যোগাযোগের দক্ষতা যেমন বাড়ে, তেমনি বাড়ে আত্মবিশ্বাসও। আর এ প্রক্রিয়ায় বিতর্ক উপস্থাপনের গুণগত মান নিশ্চিত হয়। বিতর্কের জন্য নির্ধারিত বিষয় জানার পর পরই কিছু পয়েন্ট লিখে নেবে, যেগুলো তাৎক্ষণিকভাবে তোমার মনে আসে। তবে বক্তৃতা দেওয়ার শিল্পমান অর্জনে সে টুকুই যথেষ্ট নয় । বিতর্ক প্রস্তুতির ষড়ভুজ মডেল (Hexagon Model for Debate Prep) এ ক্ষেত্রে তোমাকে পথনির্দেশ দিতে পারে।

 

বিতর্ক প্রস্তুতির ষড়ভুজ মডেল
বিতর্ক প্রস্তুতির ষড়ভুজ মডেল

 

ষড়ভুজটিতে আছে ছয়টি পদক্ষেপ বা আরও স্পষ্ট করে বলতে গেলে, ছয়টি মূল উপাদান। এগুলো তোমার সাফল্যের সম্ভাবনাকে সমৃদ্ধ করবে।

এসব পদক্ষেপের পর্যায়ক্রম কঠোরভাবে মেনে চলার আবশ্যকতা নেই। তবু এগুলো ধারাবাহিকভাবে অনুসরণ করলে তোমার বিতর্কের প্রস্তুতি যেমন সুশৃঙ্খল হবে, তেমনি অনুশীলনের অন্য যেকোনো পদ্ধতির চেয়ে বেশি ফলপ্রসূ হবে ।

১. অধ্যয়ন ও বিশ্লেষণ

প্রথমে তোমার বিতর্কের বিষয়ের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ বইপত্র এবং নিবন্ধের একটা সংক্ষিপ্ত তালিকা করে নাও। ধরা যাক, বিতর্কের বিষয়টা এ রকম জনগণের মনস্তত্ত্ব না বুঝলে অর্থনীতি অসম্পূর্ণ থাকে। অন্যান্য বিষয়ের চেয়ে এটা ব্যতিক্রমী। কারণ, এই আলোচনার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে মেলে এমন কোনো বই সচরাচর পাওয়া যায় না। এ ক্ষেত্রে তোমার করণীয় হলো, অর্থনৈতিক ইতিহাসের ওপর কিছু বইপত্র সংগ্রহ করা, যেগুলো সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিষয়টির ক্রমবিকাশ নিয়ে আলোচনা করে। গণমনস্তত্ত্ব বিষয়ে কিছু বই পেয়ে যাবে। তুমি বিষয়টির পক্ষে নাকি বিপক্ষে বলবে সেটা কোনো ব্যাপার নয় । তোমাকে অর্থনীতির মৌলিক মতবাদগুলোর ভিত্তিতে আলোচনা করতে হবে। পাশাপাশি তার ক্রমপরিবর্তন এবং গণমনস্তত্ত্বের মূল উদ্দেশ্যগুলো নিয়েও বলতে হবে।

যদি বিষয়টির পক্ষে বলতে হয়, তুমি কয়েকটি প্রাসঙ্গিক উপাদান খুঁজে বের করবে, যেগুলো অর্থনীতির বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে ভালো ধারণা দেয়। যেমন ভোক্তার আচরণ, বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত, স্টক মার্কেটের কার্যক্রম ইত্যাদি। যদি বিষয়টির বিপক্ষে অবস্থান নাও, তোমাকে অর্থনীতির কয়েকটি বিষয়ে অনুসন্ধান করতে হবে যেখানে জনগণের আবেগ-অনুভূতি উপেক্ষিত ছিল। অস্ত্রবিষয়ক কোম্পানিগুলোর সম্প্রসারণের বিনিময়ে কয়েকটি দেশের সরকার কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে জনগণের অনুভূতিকেই অবহেলা করেছে। এটাই বিশ্লেষণের অংশ।

 

বিতর্ক প্রস্তুতির ষড়ভুজ মডেল
বিতর্ক প্রস্তুতির ষড়ভুজ মডেল

 

২. কৌশল

দ্বিতীয়ত, বিতর্কের জন্য কৌশল নির্ধারণের ব্যাপারটাও গুরুত্বের দাবি রাখে। অধ্যয়ন, আলোচনাসহ জোরালো প্রস্তুতি সত্ত্বেও একটা কার্যকর কৌশলের অভাবে তুমি হেরে যেতে পার। সেটি মহাভারত ও ইলিয়াড-সম্পর্কিত পরবর্তী আলোচনায় আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে। ধরা যাক, বিতর্কের বিষয়টা এ রকম দারিদ্রা দূরীকরণে প্রবৃদ্ধিই সবচেয়ে কার্যকর কৌশল। আপাতদৃষ্টিতে তুমি এই বিষয়ের বিপক্ষে গেলে তুলনামূলক দুর্বল অবস্থানে থাকবে। কারণ ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশসহ অধিকাংশ উন্নয়নশীল দেশে প্রবৃদ্ধির গতিবৃদ্ধি এবং দারিদ্র্য হ্রাসের মতো ব্যাপারগুলো একসঙ্গে ঘটে। কিন্তু একটা বুদ্ধিদীপ্ত কৌশল এ ক্ষেত্রে তোমাকে জয়ী হতে সাহায্য করতে পারে।

প্রথমে তোমাকে প্রতিপক্ষের পথ ধরেই এগোতে হবে প্রবৃদ্ধিই দারিদ্র্য হ্রাসে সহায়ক- এই বক্তব্যে তুমি সহমত জানাবে। কিন্তু দারিদ্র্য বিমোচন এবং দারিদা হ্রাস একই ব্যাপার নয়। প্রবৃদ্ধি অবশ্যই দারিদ্র্য কমাতে কার্যকর, কিন্তু এটা সবচেয়ে বেশি ফলপ্রসূ তো নয়। দ্রুত প্রবৃদ্ধি অর্জনের অভিজ্ঞতা যেসব দেশের আছে, তাদের অধিকাংশই আয়-বৈষম্যের মুখোমুখি হয়েছে। এটা সমতা, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং দারিদা হ্রাসের জন্য একটা ক্রমবর্ধমান হুমকি হিসেবে দেখা দেয়।

উচ্চমাত্রায় সম্পদ মুষ্টিমেয় মানুষের হাতে কেন্দ্রীভূত হওয়ার পরিণামে অধিকতর দারিদ্র্য দেখা দিতে পারে। তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার জন্য যুগপৎ সরকারি নীতি থাকতে হবে যাতে করে প্রবৃদ্ধির বাড়তি সুবিধাটা শুরুতেই দরিদ্রদের মধ্যে বণ্টন হয়ে যায় । কারণ, তারাই সমাজে সুবিধাবঞ্চিত অবস্থানে রয়েছে।

এভাবে, সঠিক কৌশলই তোমাকে যেকোনো বিচক্ষণ বিচারকমণ্ডলীর সহায়তা এবং আস্থা অর্জনের সামর্থ্য এনে দেবে। এখানে তোমাকে কয়েকটি দেশের উদাহরণ যোগ করতে হবে যেখানে কেবল প্রবৃদ্ধি সেখানকার দারিদ্র্য বিমোচনে তেমন ফলপ্রসূ হয়নি। তারপর তোমাকে ফিরে যেতে হবে প্রথম ধাপে, যেখান থেকে শুরু করেছিলে।

 

বিতর্ক প্রস্তুতির ষড়ভুজ মডেল
বিতর্ক প্রস্তুতির ষড়ভুজ মডেল

 

৩. দলকর্ম

বিতর্ক অনেকটা ফুটবল বা ক্রিকেটের মতো, যেখানে দলকর্ম বা টিমওয়ার্ক এবং কার্যকর নেতৃত্ব একটা জোরদার সাফল্য নিশ্চিত করতে পারে। যেহেতু তোমার সময় মাত্র পাঁচ মিনিট এবং তোমাকে অনেকগুলো পয়েন্ট তুলে ধরতে হবে, সে ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট বা সূত্রগুলো দলের অন্য সদস্যদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। এতে করে একটা দলে তিনজন বক্তা থাকলে তোমাদের সময়সীমা ১৫ মিনিটে সম্প্রসারিত হবে। ধরা যাক, বিতর্কের বিষয়টা এ রকম “উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে অকার্যকারিতাই জাতীয় বাজেটের সবচেয়ে দুর্বল দিক।

যদি তোমার দলকে বিষয়টির বিপক্ষে বলতে হয়, তোমাদের ধারণা এবং সহায়ক উপাদানগুলোকে পর্যায়ক্রমে সাজাতে হবে, যাতে তিনজনের সবার বক্তব্যই একজন বক্তার একক ভাষণের মতো মনে হয়। অন্তত আলোচ্য বিষয়গুলোর জন্য এটা সত্যি, যদিও একেক বক্তার উপস্থাপনের ধরন একেক রকমের হয়ে থাকে। প্রথম বক্তা বাজেটের সংজ্ঞা দেবে, প্রধান প্রধান খাতে জাতীয় বাজেটে কী পরিমাণ বরাদ্দ থাকে এবং প্রতিবছর গড়ে কী পরিমাণ বাস্তবায়ন হয় ইত্যাদি তথ্য উল্লেখ করবে। প্রথম বক্তার জন্য এটুকুই পর্যাপ্ত এবং সে বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে বিতর্কের বিষয়ের পক্ষে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরতে পারবে।

এবার দ্বিতীয় বক্তার পালা। সে কোনো সংজ্ঞা বা পরিসংখ্যান নিয়ে বলতে যাবে না। এ কাজ প্রথম বক্তা আগেই সেরে ফেলেছে। দ্বিতীয় বক্তা বরং শুরু করবে, কীভাবে বাজেট বাস্তবায়নের দুর্বলতা অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে এবং জনগণকে নির্বিচারে দুর্ভোগের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তৃতীয় বক্তা কয়েকটি জটিল ব্যাপারে গভীরতর আলোচনায় যাবে, যেমন বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে দুর্বলতা কীভাবে নৈতিক অনিশ্চয়তা তৈরি করে এবং দুর্নীতিকে আশ্রয় দেয়, যা অনুন্নয়নের একটা দুষ্টচক্র তৈরি করে।

এ পর্যায়ে তৃতীয় বক্তাকে, যে একই সঙ্গে দলনেতা, যুক্তি খণ্ডনের জন্য পর্যাপ্ত সময় বরাদ্দ রাখতে হবে। তাই দলনেতা তার দ্বিতীয় বক্তার জন্য বিষয়ের পক্ষে বলার জন্য বেশি সুযোগ দেবে এবং বিতর্কের মাঝখানে দ্বিতীয় বক্তাকেই সবচেয়ে বেশি পয়েন্ট তুলে ধরতে হবে। তৃতীয় বক্তাকে তার আগের বক্তার চেয়ে বেশি গ্রহণযোগ্যভাবে কয়েকটি বিষয়ের স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে হতে পারে, যা দ্বিতীয়জন হয়তো ততটা বিশদভাবে বলার সুযোগ পায়নি।

এভাবে সুন্দর একটা দলকর্ম একটা বিতর্ক অনুষ্ঠানকে একক নাটকের মতো করে তুলে ধরতে পারে, যার সমাপ্তি টানার কাজটা দলনেতার। পুনরাবৃত্তি এড়িয়ে এবং নতুন নতুন পয়েন্ট যোগ করে বিতর্ক চালিয়ে যাওয়ার ভিত্তিটা আসে পূর্ববর্তী দলকর্ম থেকেই ।

 

বিতর্ক প্রস্তুতির ষড়ভুজ মডেল
বিতর্ক প্রস্তুতির ষড়ভুজ মডেল

 

৪. যুক্তি ও খণ্ডন

যুক্তি ও খণ্ডন একটা বিতর্কের মূল আকর্ষণ তৈরি করে। কেউ কেউ মনে করেন, এগুলো বিতর্ক অনুষ্ঠানের সময় মঞ্চেই প্রস্তুত হবে। একজন দক্ষ বক্তার জন্য এটা সত্যি নয়। কারণ, সে প্রায় অর্ধেক যুক্তি এবং খণ্ডনের কাজটা আগেই গুছিয়ে রাখে। নির্ধারিত বিষয়ের ওপর অধ্যয়ন ও বিশ্লেষণের সময়ই এটা সম্পন্ন হয়। তবে প্রথম বক্তা দু-একটি পয়েন্ট খণ্ডনের শুরুটা করে দিতে পারেন। আবার প্রতিপক্ষও এর সূচনা করতে পারে। প্রতিপক্ষ যদি সত্যিই সেই পয়েন্টটির কথা আগে থেকে ভেবে থাকে, অপ্রত্যাশিত আক্রমণে তারা কিছুটা অপ্রস্তুত হতে পারে।

ধরা যাক, বিতর্কের বিষয়টা এ রকম উন্নয়নের দ্রুততর পথ হিসেবে বাংলাদেশে শিল্প খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়ার সময় এসেছে। তুমি বিষয়টির বিপক্ষে বিতর্ক করছ। সে ক্ষেত্রে তোমার যুক্তিগুলো কৃষি এবং সেবা খাতের অনুকূলে অবশ্যই আগে থেকে প্রস্তুত করে রাখতে হবে। আবার কৌশলের প্রশ্নটা চলে আসে; উন্নয়নের একটা দ্রুততর পথ হিসেবে শিল্প খাতের ভূমিকাকে তুমি বাদ দিতে পারবে না । কিন্তু তোমাকে প্রতিপক্ষের দুর্বলতার জায়গাটা ধরতে হবে, আর সেটা হলো ‘অগ্রাধিকার’ শব্দটা।

তুমি যুক্তি দেখাতে পারো, কৃষি এখনো জাতীয় কর্মসংস্থানের ৪০ শতাংশের বেশি জুড়ে আছে। আমাদের এখনো কৃষিকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। তাহলে শিল্প খাত এবং সেবা খাত—দুটিরই ভালো হবে। কাঁচামাল যেমন পাওয়া যাবে তেমনি শ্রমশক্তিরও উন্নতি হবে।

এভাবে একটা উপযুক্ত কৌশল তোমার যুক্তিখণ্ডনের পয়েন্টগুলো সাজাতে সাহায্য করে এবং বক্তব্য উপস্থাপনে প্রাণ সঞ্চার করে। খণ্ডন বা প্রতিপক্ষের আক্রমণ প্রতিহত করার ব্যাপারটা অপর্যাপ্ত হলে যেকোনো বিতর্ককে তোতাপাখির মুখস্থ করা বক্তব্যের মতো মনে হয়। একজন বক্তাকে যেকোনো অবস্থায় এমন দুর্বলতাগুলো কাটিয়ে উঠতে হবে।

 

বিতর্ক প্রস্তুতির ষড়ভুজ মডেল
বিতর্ক প্রস্তুতির ষড়ভুজ মডেল

 

৫. চর্চা ও যোগাযোগ

যখন তোমার আসল পরীক্ষা শুরু হয়, চর্চাটা সেই পর্যায়েই সবচেয়ে ভালোভাবে সম্পন্ন হয়। তোমার পরিবারের সদস্য বা সহপাঠীদের সামনে বিতর্কের অনুশীলনটা করে নিতে পারো। তারা তোমাকে উৎসাহের পাশাপাশি ভালো পরামর্শ দিতে পারবে। এ পর্যায়ে তুমি তাদের মুখগুলো দেখবে এবং সামনাসামনি একটা যোগাযোগ স্থাপনের মাধ্যমে বুঝতে পারবে তারা তোমার বক্তব্য কতটা গ্রহণ করতে পারছে। বারবার চর্চা তোমার যোগাযোগ দক্ষতা বাড়াতে সহায়তা করবে এবং আত্মবিশ্বাস জোরালো করবে। ফলে তুমি যেকোনো বিষয়ে একজন ভালো বিতার্কিক হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলতে পারবে।

ধরা যাক, বিতর্কের বিষয়টা এ রকম ‘সাহিত্যের তুলনায় ইতিহাস বেশি আকর্ষণীয়’। যদি তুমি বিষয়টির বিপক্ষে বক্তব্য দাও, তোমাকে নিশ্চিত করতে হবে তোমার সবগুলো পয়েন্ট যাতে জোরালো হয়। এসবের মধ্যে থাকবে নানা ঘটনা, কবিতা ও উপন্যাসের ছোট ছোট নমুনা, উল্লেখযোগ্য সাহিত্যিকদের কাজের উদাহরণ।

অবশেষে থাকবে প্রাচীন মহাকাব্যগুলো কীভাবে আমাদেরকে ইতিহাসের চেয়ে বেশি আকর্ষণীয় করে গল্প বলতে পারে, সে বিষয়ে বক্তব্য । যদি তুমি বাড়িতেই চর্চার বন্দোবস্ত করো, যেসব পয়েন্টে হাততালি বেশি পড়ে সেগুলো চিহ্নিত করে অধিকতর সহজবোধ্য ও জনপ্রিয় হিসেবে বেছে নিতে পারবে। কারণ, এখানকার দর্শক-শ্রোতা তোমাকে নিরপেক্ষ মতামত দিতে পারবে। এভাবে তোমার বক্তব্যে যোগাযোগ-দক্ষতার পরীক্ষা হতে পারে। মূল বিতর্ক অনুষ্ঠানে যাওয়ার আগে বারবার অনুশীলনের মাধ্যমে এটার উন্নতি সম্ভব।

তুমি যোগাযোগের অন্যান্য ধরন যাচাই করে দেখতে পারো। এতে কোথায় তোমার দুর্বলতা এবং কোথায় শক্তি, সেগুলো স্পষ্ট হবে। একটা ভালো বিতর্ক বক্তা ও শ্রোতার আবেগ এবং উপলব্ধির মধ্যে একটা প্রত্যক্ষ যোগাযোগ স্থাপন করতে পারে।

 

৬. প্রেরণা ও নেতৃত্ব

বিতর্কের চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো, যে পয়েন্টের ওপর তুমি কথা বলছ, সে বিষয়ে দর্শকদের অনুপ্রাণিত করা। বক্তা এটা প্রস্তুতিপর্বেই বুঝতে পারে। তুমি বরং দর্শক শ্রোতাদের জিজ্ঞেস করে দেখতে পারো, তুমি যেটা প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছ সেটা তাঁরা বুঝতে পেরেছেন কি না। উত্তরটা যদি ‘না’ হয়, বুঝতে হবে তোমার বক্তব্যের উপাদানগুলো দুর্বল এবং তাতে কিছু একটা অনুপস্থিত ছিল। একদম শুরু থেকে খুঁজে দেখো কোথায় তুমি সঠিক জিনিসটা ঠিকমতো তুলে ধরতে ব্যর্থ হয়েছ।

ধরা যাক, বিতর্কের বিষয়টা এ রকম ঢাকায় পাতালরেলের বিকল্প নেই।’ তোমাকে দর্শকদের অবশ্যই সন্তুষ্ট করতে হবে যে তুমি পাতালরেলের বিকল্প উপায়গুলোও যাচাই করে দেখেছ। যেমন উন্নততর গণপরিবহন – বাস এবং – ভূপৃষ্ঠে চলা মেট্রোরেল ইত্যাদি। ঢাকার মতো একটা সাংঘাতিক ঘনবসতিপূর্ণ নগরে ভূপৃষ্ঠের ওপর দিয়ে চলমান যানবাহনের ক্রমবর্ধমান সীমাবদ্ধতাগুলোও তোমাকে তুলে ধরতে হবে। আর পাতালরেলের ব্যয় সম্পর্কে কিছু তথ্য-উপাত্ত দিতে হবে যেগুলো দেশের জন্য এই মুহূর্তে বাস্তবায়নের উপযোগী।

তোমার প্রেরণাই নেতৃত্বের একটা ভিত গড়ে দেবে, যা সব বিতার্কিকের সামনে পড়ে থাকা একটা বড় কাজ। নেতৃত্ব মানে এই নয় যে তুমি নিজের ইচ্ছেমতো দলনেতা হবে। এটা অন্যকে প্রভাবিত করার একটা ক্ষমতা, যা তুমি নিজের প্রেরণাদায়ী কাজে সফল হলেই অর্জন করতে পারবে। মঞ্চে প্রবেশের আগে যদি তোমার প্রস্তুতি এই ছয়টি দিকের সবগুলোতে পর্যাপ্ত হয়ে থাকে, তুমি একটা ভিন্ন অনুভূতি অর্জন করতে পারবে।

আর সেটা হলো, তুমি কেবল একটা বক্তব্য দিতে যাচ্ছ না বরং একজন নেতার মতো তোমার জন্য নির্ধারিত একটা বিষয়ের ওপর বক্তব্য দিয়ে জনসাধারণকে প্রভাবিত করতে চলেছ। এভাবে, আমরা বক্তব্যদানে সাফল্য অর্জনের যড়ভূজ পূর্ণ করি। আমি মনে করি, বিতর্ক প্রস্তুতির ষড়ভুজটি বিতর্ক এবং জনসমক্ষে বক্তব্য দেওয়ার দুর্দান্ত গুণাবলি অর্জনের জন্য একটা মূল্যবান কাঠামো বা মডেল হিসেবে কাজে লাগবে।

Leave a Comment