বিতর্কে সংগীত

আজকে আমাদের আলোচনার বিষয়ঃ বিতর্কে সংগীত

 

বিতর্কে সংগীত
বিতর্কে সংগীত

 

বিতর্কে সংগীত

ভাব প্রকাশ ও ভাবের আদান-প্রদান সম্ভব না হলে মানবসভ্যতা গড়ে উঠত না। মানবিক সত্তার যা কিছু শ্রেষ্ঠ বা স্বতন্ত্র তার মূলে কাজ করেছে ভাব প্রকাশ ও ভাবের বিনিময়, যার বেশ কিছু রূপ বিদ্যমান, যেমন অঙ্গভঙ্গি, কথা, কবিতা, গান, অঙ্কন ও লেখা। ভাব প্রকাশ ও বিনিময়ের এ মাধ্যমগুলো সৃষ্টি করেছে বহুবিধ শিক্ষার মাধ্যম। যেমন অভিনয়, নৃত্য, আবৃত্তি, সংগীত, রচনা, বিতর্ক, অঙ্কন প্রভৃতি । প্রতিটি শিল্পমাধ্যম আবার সর্বাত্মকভাবে স্বতন্ত্র নয় ।

প্রতিটি শিল্পের সঙ্গে অন্য কিছু শিল্পের আংশিক নির্ভরতা বা আন্তযোগাযোগ রয়েছে। যেমন সংগীতে রয়েছে অভিনয়। আবার অভিনয়েও রয়েছে সংগীত। নৃত্যে রয়েছে সংগীত, সংগীতে রয়েছে নৃত্য, বিতর্কে রয়েছে অভিনয়, অভিনয় রয়েছে আবৃত্তিতেও। এককথায় শিল্প মানে সৃষ্টি। আর সৃষ্টি মানেই পরিশীলিত মিশ্রণ। অতএব, সব শিল্পেই মিশ্ৰণ অনিবার্য ।

বিতর্ক একটি উদ্বুদ্ধকরণের শিল্প। এ শিল্পে অন্য শিল্পের মঙ্গলজনক অনুপ্রবেশ ঘটবে, এটিই তো স্বাভাবিক। বিতর্ককে একটি নির্দিষ্ট কাঠামো বা ধারণার মধ্যে স্থির করে ফেলা জড়বাদী মনোভাবের পরিচায়ক। তাই বিতর্ক মানে নয় একটি নির্দিষ্ট সময়-কাঠামোতে আবদ্ধ কিছু কথার বিস্ফোরণ মাত্র। অন্যান্য শিল্পের মতো এটিও তার উদ্বুদ্ধকরণের লক্ষ্য স্থির করে বাচনিক মাধ্যমের প্রাধান্য বজায় রেখে অন্যান্য শিল্পের সহায়তামূলক ব্যবহার নিশ্চিত করবে এবং নিজের মধ্যে প্রয়োজন সাপেক্ষে অন্যান্য শিল্পের মঙ্গলজনক অনুপ্রবেশ ঘটাবে। ইদানীং বেশ কিছু আধুনিক বিতর্কে বক্তারা সংগীতের আশ্রয় নিচ্ছেন। সংগীত বলতে এখানে ব্যাপক অর্থে না গিয়ে শুধু গীত ও প্রাসঙ্গিক অভিনয় বোঝানো হচ্ছে ।

বিতর্কে সংগীতের ব্যবহার নিয়ে অনেকে বিতর্ক উত্থাপন করেছেন। তাঁদের বক্তব্য হচ্ছে ১. এতে বিতর্কের স্বাতন্ত্র্য বিনষ্ট হতে পারে, ২. বিতর্কের সিরিয়াস ভাব ক্ষুণ্ণ হতে পারে, ৩. বিতর্ক তার লক্ষ্য থেকে সরে আসতে পারে, ৪. বাচনিক মাধ্যমের প্রাধান্য ক্ষুণ্ণ হতে পারে, ৫ বিতার্কিককে সুর সাধনায় বাধ্য করে তুলতে পারে। যার ফলে বিতর্কের জন্য সঠিক অর্থে প্রদানযোগ্য মনোযোগের ঘাটতি দেখা দিতে পারে ইত্যাদি ইত্যাদি। বলা বাহুল্য, এগুলোকে বক্তব্য বা যুক্তি না বলে আশঙ্কা বলা যায়। কারণ, কোনোটিই এখন পর্যন্ত সঠিকভাবে প্রমাণিত নয় ।

 

বিতর্কে সংগীত
বিতর্কে সংগীত

 

অন্য অনেক শিল্পের মতো বিতর্কও একটি যৌগিক শিল্প। যৌগিক শিল্পে অন্য শিল্পের যোগ-বিয়োগ ঘটাই স্বাভাবিক। নাট্যশিল্প ও একটি যৌগিক কলা, যা তার নিজের প্রয়োজনে বা স্বার্থে অন্য শিল্পের ভালো অংশগুলো সঞ্চয়ন করে নিজের মধ্যে। ব্যবহার করছে। সুতরাং, বিতর্কের শ্রীবৃদ্ধির স্বার্থেই বিতর্কে সংগীতের ব্যবহার গ্রহণযোগ্য ৷ তা ছাড়া এক শিল্পের সঙ্গে আরেক শিল্পের যোগ ফলাফলের দিক দিয়ে সাধারণ যোগকে অতিক্রম করে যায়। অর্থাৎ ১+১ = ২ হওয়ার কথা, কিন্তু মোট ফলাফল ২-এর চেয়ে বেশি হয়। এটিকে সম্প্রসারিত প্রভাব বা সিনার্জি ইফেক্ট বলে। বিতর্কে সংগীতের ব্যবহার এরূপ সম্প্রসারিত প্রভাব সৃষ্টি করতে সক্ষম।

আমরা পেশাগত জীবনে যে যা-ই কিছু করি না কেন, সংগীত আমাদের জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। বিশ্বে প্রতিটি শিল্পের অনুরাগী দল রয়েছে। এদের মধ্যে সংগীত অনুরাগী দল বিশ্বের বুকে বৃহত্তম সম্প্রদায়। অর্ফিয়ুসের সংগীতে সবাই মুগ্ধ হয়ে তাঁর পেছনে ধাবিত হতো। হ্যামিলিনের বংশীবাদক নগরীর সব শিশুকে তার পেছনে জড়ো করতে পারত। সংগীত কঠিন, সংগীত মধুর। নিরোর বাঁশি অসময়ের হলেও সংগীত। সুর, বাণী ও ভাব সংগীতের ত্রয়ী শক্তি । সুর চিরকালই মানুষকে উদ্বুদ্ধ করে। কৃষ্ণের বাঁশির সুরে রাধা ব্যাকুল হয়ে বেরিয়ে এসেছে কুঞ্জবনে। এ নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে প্রেম-বিরহের অমর কাব্য কিংবা মধ্যযুগের বৈষ্ণব পদাবলী-

বঁধু হে, কী আর কহিব আমি।
জীবনে মরণে সাধনে ভজনে
প্রাণনাথ হইও তুমি ।

আসলে সংগীতের সৃষ্টি না হলে মানবিক অনুভূতির পূর্ণতা আসত না। সংগীতের ভেতর দিয়ে মানুষ পৃথিবীর অনেক কিছু চিনতে পেরেছে, উপলব্ধি করতে পেরেছে পরমাত্মীয় জীবনবোধকে। তাই তো বিশ্ব কবির ভাষায়ঃ

গানের ভিতর দিয়ে যখন দেখি ভুবনখানি
তখন তারে চিনি আমি, তখন তারে জানি।
তখন তারি আলোর ভাষায় আকাশ ভরে ভালোবাসায়

রূপের রেখা রসের ধারায় আপন সীমা কোথায় হারায়
তখন দেখি আমার সাথে সবার কানাকানি ।

অর্থাৎ, গানের ভেতর দিয়ে কিছু যেন একাকার হয়ে, আপন হয়ে যায় পরম ভালোবাসায়। সংগীত তাই বিতর্কের পরম ভালোবাসার হাতিয়ার। বিতর্ক ও সংগীতের পরম উদ্দেশ্যের মধ্যে যদি বিরোধ না থাকে, তাহলে বিতর্কে সংগীতের আত্তীকরণে বাধা কোথায়? বিতর্কের পরম উদ্দেশ্য হচ্ছে মনস্তাত্ত্বিক বিনোদন ও উদ্বুদ্ধকরণ। পৃথিবীর তাবৎ গৌরবযোগ্য সংগীতের উদ্দেশ্য তা-ই। বিরোধ তো নেই-ই, বরং রয়েছে অনিবার্য বন্ধুত্ব। তাই মনস্তাত্ত্বিক বিনোদন ও উদ্বুদ্ধকরণের লক্ষ্যসাধনে বিতর্ক সংগীত থেকে প্রয়োজন সাপেক্ষে উপাদান নেবে, কিংবা পুষ্পচয়ন করবে—এ তো বিতর্কের জন্য এক মধুময় কল্যাণ বার্তা, যেন সোনায় সোহাগা।

 

বিতর্কে সংগীত
বিতর্কে সংগীত

 

এক-একজন বিতার্কিক মানেই চিত্তের সৈনিক। আশির শুরুতে বিতার্কিকদের একটা স্লোগান ছিল বিতর্ক মননশীলতার উৎকর্ষ সাধন করে’। অর্থাৎ, বিতর্কের মাধ্যমে আমরা চিত্তকে শাণিত ও তরঙ্গিত করতে চাই। এখানেও সংগীতের সঙ্গে বিতর্কের মধুর সখ্য। কবির কথায়

জাগ জাগরে জাগ রে সংগীত-
চিত্ত অম্বর কর তরঙ্গিত
নিবিড়নন্দিত প্রেম কম্পিত
হৃদয়কুঞ্জ বিতানে।

কাজী নজরুল ইসলামকে বিদ্রোহী কবি বলা হলেও গানের মধ্য দিয়ে তিনি শতরূপে প্রকাশিত হয়েছেন। আমরা জানি, বাংলা সাহিত্যে তাঁর সংগীতের সংখ্যা সর্বোচ্চ। তিনি ঘৃণা, বিদ্রোহ, বেদনা, ক্ষোভ, প্রতিবাদ—এই সবকিছু প্রকাশের জন্য সংগীতের আশ্রয় নিয়েছেন। আবার পরম শ্রদ্ধা ও নিবেদন করেছেন সংগীতে

অঞ্জলি লহো মোর সংগীতে—
তোমারে, সুন্দর, বন্দিতে।
পুলকে বিকশিল প্রেমের শতদল
গন্ধে রূপে রসে করিছে টলমল
তোমার পদতল রঞ্জিতে। সংগীতে সংগীতে।

রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল আমাদের হৃদয়ে বেঁচে থাকবেন তাঁদের গানের মধ্য দিয়ে। ভূপেন হাজারিকার ভাষায়ঃ

সবার হৃদয়ে রবীন্দ্রনাথ চেতনাতে নজরুল।
যতই আসুক বিঘ্ন বিপন হাওয়া হোক প্রতিকূল
একহাতে বাজে অগ্নিবীণা কণ্ঠে গীতাঞ্জলি
হাজার সূর্য চোখের তারায় আমরা যে পথ চলি?

তাই বিতর্কে যখন আমরা হৃদয়ের কথা বলব, চেতনার কথা বলব, তখন রবীন্দ্রনাথ কিংবা নজরুল তাদের গানের মধ্য দিয়ে আমাদের উচ্চারণে মূর্ত হয়ে উঠবেন—এটাই তো স্বাভাবিক। বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসু যেমন পরম লক্ষ্যের বিচারে বা সত্যানুসন্ধানের বিচারে কবিতা ও বিজ্ঞানের মধ্যে বিরোধ খুঁজে পাননি, একইভাবে পরম লক্ষ্যের বিচারে বিতর্ক ও সংগীতের মধ্যে কোনো বিরোধ আবিষ্কৃত হয় না । বরং ধরা পড়ে পরম মিত্রতা, কখনো পরিপূরকতা।

অনেকে বলেছেন, “হ্যাঁ, বিতর্কে গান আসতে পারে। কিন্তু তা আসবে শুধু বাণী নিয়ে। বিতার্কিক ও বাণীগুলো উচ্চারণ করবেন আবৃত্তির ধাঁচে। এ-জাতীয় মতামতের পেছনে কিছু যুক্তি থাকে। প্রথমত, বিতার্কিক একজন ভালো বা চলনসই গায়ক বা গায়িকা না-ও হতে পারেন। বাস্তবের অধিকাংশ ক্ষেত্রে এটি সত্য। তাই গানের সুর তুলতে গিয়ে বিতার্কিক একটা বিপদে পড়ে যেতে পারেন। পাছে বক্তৃতার রসভঙ্গ ঘটিয়ে বক্তা নাকি সুদ-আসল সবই হারান-এর ভয়ও থাকে। তাই সুর না তোলাই ভালো। দ্বিতীয়ত, বক্তৃতার মধ্যে সুরসহ গান ঢুকে গেলে কথা বা বক্তৃতা হয়তো ম্লান হয়ে পড়তে পারে ।

বর্তমান পরিস্থিতির বিচারে প্রথম অবস্থাটি সত্য, কিন্তু পরমার্থ নয়। অর্থাৎ, অধিকাংশ বিতার্কিক হয়তো সংগীতে দক্ষ বা চলনসই নন। কিন্তু এ অবস্থাটিই যে শ্রেষ্ঠ মডেল, তা মেনে নেওয়া যায় না। আজ প্রতিযোগিতার যুগ, গুণ ও দক্ষতা অর্জনের যুগ। সত্যজিৎ রায় ছিলেন বিশ্বনন্দিত চিত্র পরিচালক। কিন্তু তিনি সংগীত, সংলাপ, আলোক, সেট, সজ্জা সবকিছুতেই পারদর্শী ছিলেন বলেই তাঁর ছবি আর দশজন চিত্র পরিচালকের ছবি থেকে আলাদা। ছবি করেছেন অল্প কিন্তু প্রতিটিই ছিনিয়ে এনেছে জাতীয় বা আন্তর্জাতিক পুরস্কার।

আবৃত্তি না জানলেও বিতার্কিক হওয়া যায়, কিন্তু যিনি আবৃত্তি জানেন সেটি তাঁর জন্য বাড়তি গুণ । বাড়তি বলে ফেলনা নয়, বরং তা সংযোগী শক্তি। ঠিক সেরূপ সংগীত জানা বিতার্কিক অবশ্যই কিছু বাড়তি সুবিধা অর্জন করবেন – এটি – স্বাভাবিক। জাদুশিল্পী তাঁর সংগীতগুণের জন্য তাঁর খ্যাতিকে আরও শাণিত করতে পেরেছেন। সমমানের অন্য দশজন জাদুশিল্পীকে ডিঙিয়ে গেছেন। তাই আধুনিক প্রতিযোগিতার যুগে মুক্তবাজারের কুরুক্ষেত্রে একজন বিতার্কিক নিজেকে সংগীত, আবৃত্তি, অভিনয়, কণ্ঠশীলন প্রভৃতি নানা গুণে সমৃদ্ধ থেকে সমৃদ্ধতর করবেন—এটা সংগতভাবে প্রত্যাশিত।

দ্বিতীয় আশঙ্কা হচ্ছে, বিতর্কে সংগীতের ব্যবহার বক্তৃতার মেজাজ বা অস্তিত্বকে ম্লান করে দেবে কি না । এটা আসলে নির্ভর করছে বিতার্কিকের সংগীত প্রয়োগের ক্ষমতা বা সতর্কতার ওপর। বিতার্কিক নিজের বক্তব্যে সতর্কতা বা প্রয়োজনীয়তা জানের বলে কতটুকু সংগীত ব্যবহার করবেন এবং এভাবে কতটা দ্রুত মানুষকে উদ্বুদ্ধ করবেন, সেটা নির্ভর করছে তাঁর নিজস্ব বুদ্ধির ওপর।

 

বক্তব্যের মধ্যে সংগীতের ঢল বয়ে গেলে দোষটা সংগীতের নয়, দোষটা প্রয়োগকর্তার। ওরকম ভয় থাকলে কবিতা বা আবৃত্তির বেলায়ও একই প্রশ্ন তোলা যায়। তা ছাড়া বিতর্কে ন্যূনতম একটা অভিনয় থাকে। তাই বলে বিতর্ককে কেউ অভিনয় বলে না। আর যদিই বা বলে, তাহলে বুঝতে হবে বিতার্কিক তাঁর কাঙ্ক্ষিত সীমা বা শৈলী প্রয়োগের বোধ হারিয়ে ফেলেছেন । ওস্তাদ আমজাদ আলী খান যখন সংগীতের আসরে বসেন, তখন প্রয়োজনীয় ন্যূনতম অভিনয় তাঁর ‘সংগীতজ্ঞ সত্তা’কে ডুবিয়ে দেয় না।

বিতর্কের মধ্যে সংগীতর ব্যবহার কতটুকু হবে, তার কোনো নির্দিষ্ট মাপক যন্ত্র নেই। এটি সম্পূর্ণ নির্ভর করছে বিতর্কের বিষয়বস্তু, মেজাজ এবং বক্তার নিজস্ব বুদ্ধিমত্তা ও শৈলী প্রয়োগের বোধের ওপর। যেটুকুই হোক, সেটুকু যদি খুব কমও হয়, তাহলেও ক্ষতি নেই। কিন্তু ওইটুকু অবিকৃতভাবে আসা উচিত, সুর নিয়ে আসা উচিত। শুধু বাণী নিয়ে এলে সংগীত পূর্ণ হয় না, ভাবও সুন্দর হয় না। আসলে সুর, বাণী ও ভাব সংগীতের এই ত্রয়ীশক্তি পরস্পর অবিচ্ছেদ্য। একটিকে সরিয়ে নিলে অন্য দুটির স্বাস্থ্যহানি ঘটে।

অনেকে ভাবতে পারেন, বিতর্কের মধ্যে যদি দুটি গানের লাইন বলি, তাহলে বাণী বা কথাই তো আসল। তা হয়তো ঠিক। কিন্তু ওই বাণী আরও হৃদয়গ্রাহী হয়েছে, আরও উদ্বুদ্ধকারী হয়েছে নিশ্চয়ই সুরের সংযোজনে। সুর হচ্ছে বাণীর আত্মা। তাই সুরহীন বাণীর প্রয়োগ অনেক ক্ষেত্রে যেন আত্মাহীন দেহের উপস্থাপন। রবীন্দ্রনাথ বা নজরুলের গানগুলো সুরবিহীন অবস্থায় যেন উন্নত কবিতাগুচ্ছ। সুর তাঁদের দিয়েছে জীবন্ত মাত্রিকতা। সৃষ্টি করেছে দুই সুরের দুই ভুবন। অধিকাংশ সময়ে যেন প্রথম ভালোবাসা হয়ে যায় সুর, তারপর আমরা সেই সুরের কানন থেকে বাণী পুষ্পের সঞ্চয়ন করি, কখনো বিশ্লেষণ করি । তাই তো রবীন্দ্রনাথ সুরকে শ্রদ্ধার অনেক বড় আসনে স্থান দিয়েছেন

দাঁড়িয়ে আছ তুমি আমার গানের ওপারে
আমার সুরগুলি পায় চরণ, আমি পাই নে তোমারে ॥

পূজা পর্বে তিনি বলেছেন

বিশ্বকবির চিত্ত মাঝে ভুবনবীণা যেথায় বাজে
জীবন তোমার সুরের ধারায় পড়ুক সেথায় লুটে।
আমার সুরে লাগে তোমার হাসি

দিবানিশি আমিও যে ফিরি তোমার সুরের খোঁজে। কিংবা-
“গানের সুরের আসন খানি পাতি পথের ধারে
ওগো পথিক, তুমি এসে বসবে বারে বারে ।

কিংবা কবি নজরুলের সুরে ‘আজি মধুর বাঁশরী বাজে। এখানে সুরই মুখ্য, সুরই মধুর। তাই সেই কৃষ্ণ থেকে আজকের চৌরাশিয়ার বাঁশি, বিসমিল্লাহ খানের সানাই, বিটোফেন থেকে তানসেন, মোৎসার্ট থেকে ইয়ানি, ভিজিযোগ কিংবা ইয়াহুদি মেনুহিনের বেহালা, আলী আকবর খাঁ, জর্জ হ্যারিসন ও রবিশংকরের সংগীত—সর্বত্রই যেন সুরের রাজটীকা, সুরের জয়জয়কার। তাই বিতার্কিকের বক্তব্যে সংগীত সুরবঞ্চিত হলে বক্তব্যও যেন অনেকাংশে কাঙাল হয়ে পড়ে ৷ তাই বক্তা প্রয়োজনীয় সুরটুকু যথাসম্ভব আয়ত্ত করেই মঞ্চে উঠবেন এবং যথাসময়ে তা প্রয়োগ করে সৃষ্টি করবেন—

১) এক বৈচিত্র্যের স্বাদ

২) এক হৃদয়গ্রাহী আবহ, এবং

৩) একদল গুণমুগ্ধ দর্শক-শ্রোতা

যাঁদের অন্তর স্পর্শ করে উদ্বুদ্ধকরণের লক্ষ্যটি সম্পন্ন করবেন—এটাই তো প্রত্যাশিত। এভাবেই একজন বিতার্কিক গুণের অর্জন, প্রকাশ ও বিনিময়ে সার্থক থেকে সার্থকতর হবেন ।

ইদানীং রম্য বিতর্ক সংগীতের ব্যবহার হচ্ছে। এ থেকে সংগীত আসলে রম্য বিতর্কের জন্যই মানানসই—এ রকম ধারণা পোষণ করলে তা প্রথমত সংগীতের প্রতি অশ্রদ্ধা জ্ঞাপন করা হয়। দ্বিতীয়ত, রম্য বিতর্কের অবমূল্যায়ন করা এবং এ ধারায় বিতর্ক সম্বন্ধে ভ্রান্ত ধারণা পোষণ করা হয়। তৃতীয়ত, সামগ্রিকভাবে বিতর্ককে একটি খণ্ডিত এবং জড়বাদী কাঠামোতে আবদ্ধ করা হয় ।

বিতর্ক কখনো স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মকানুন নয়, যা সার্কুলারের ওপর ভিত্তি করে কাঠখোট্টা ধারায় চালিত হবে। এটি একটি সৃজনশীল শিল্পমাধ্যম, যা যুগ ও মানবিক চাহিদার প্রয়োজনে পরিবর্তিত, বিবর্তিত ও বিকশিত হবে। বিকাশের অনিবার্য সূত্র হচ্ছে দ্বন্দ্ব ও মিলন। এই বিকাশের ধারায় বিতর্কে প্রয়োজন সাপেক্ষে সংগীতের আমন্ত্রণ বা ব্যবহার নিঃসন্দেহে উদ্বুদ্ধকরণের উদ্দেশ্যকে করে তুলবে আরও শক্তিধর, আরও প্রাণবন্ত ।

Leave a Comment