বিতর্কে রম্য

আজকে আমরা আলোচনা করবো বিতর্কে রম্য

 

রম্য বিতর্ক
রম্য বিতর্ক

 

বিতর্কে রম্য

বাংলাদেশের বিতর্ক অঙ্গনে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে রম্য বিতর্ক। রম্য মানেই রমণীয়, অর্থাৎ আনন্দের ব্যাপার। অতএব, রম্য বিতর্ক বরাবরই জনপ্রিয়। আমাদের সাংস্কৃতিক তোলপাড় বরাবরই রাজধানীকেন্দ্রিক কিংবা রাজধানীতে এর প্রবণতা বেশি। বিতর্কচর্চার ক্ষেত্রেও এ কথাটি সত্য। বিতর্কচর্চা কেন রাজধানীতে বেশি হচ্ছে, তার একটা বড় কারণ বিতর্কের প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিকতা।

অর্থাৎ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বিতর্কের আনুষ্ঠানিক বা নিয়মিত পৃষ্ঠপোষকতা করে থাকে। এ ক্ষেত্রে নাটক, সংগীত বা আবৃত্তিচর্চা অনেক বেশি স্বাধীন। যেহেতু রাজধানীতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মান ও সংখ্যায় সর্বোচ্চ, সেহেতু এই রাজধানীতেই বিতর্কের চর্চা বেশি। রম্য বিতর্ক এই বিতর্কচর্চারই উদীয়মান অনুষঙ্গ। দিন দিন এর জনপ্রিয়তা বাড়ছে। তাই বিষয়টির ওপর গুরুত্ব প্রদান জরুরি।

এভাবে ঢাকঢোল পিটিয়ে গুরুত্ব প্রদানের পেছনে কোনো রকম অনুর্বর উদ্দেশ্য থাকতে পারে বলে অনেকে সন্দেহও করতে পারেন। পাকিস্তান আমলে রবীন্দ্রসংগীতের জনপ্রিয়তা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পাকিস্তানি শাসকেরা কিছু নীতিমালা প্রণয়নে তৎপর হয়ে পড়েছিলেন। শিল্প মানেই সৃজনশীলতা ও স্বাধীন সৃষ্টির বিষয়। এই শিল্পও কোনো শৃঙ্খল মানে না। তবে মানে শৃঙ্খলা, যা সংগীতও মানে। তাই কোনো গান তার মুখ, অন্তরা ও সঞ্চারির সুর এক বানিয়ে ফেলে না। গানের অন্তরা ও সঞ্চারী তার মুখের সুরকে আরও মধুর করে তোলে।

বিতর্কেও রয়েছে অনেকটা সে রকম অন্তরা বা সঞ্চারী, যা বিতর্কের মুখ তথা বিষয়বস্তুকে আরও মধুর, আরও প্রতিষ্ঠিত করে তোলে। তাই রম্য বিতর্কের বিষয়টি নিয়ে আমরা গুরুত্বের সঙ্গে ভাবতে পারি। এই ভাবনা থেকে বেরিয়ে আসবে কিছু বৈশিষ্ট্য বা গাঁথুনি, যা রম্য বিতর্ককে আরও সমৃদ্ধ করতে পারে ।

 

বারোয়ারী বিতর্ক
বারোয়ারী বিতর্ক

 

১. রম্য বিতর্কের পরিমণ্ডল:

রম্য বিতর্কের পরিমণ্ডল হচ্ছে এ বিতর্কের পরিধি। সহজ কথায় এ বিতর্কের বিষয়বস্তুগুলোর কেন্দ্রিকতা কী হবে।

একটি খুব চালু ধারণা রয়েছে যে প্রেমের বিষয় ছাড়া রম্য বিতর্ক অচল । এর পাশাপাশি আরেকটি ধারণা বা চর্চা রয়েছে যে রম্য বিতর্কে ব্যক্তিগত আক্রমণ বা ব্যক্তিগত ঘটনার উল্লেখ খুব জমে ওঠে। এমনই জমে ওঠে যে ওটা ছাড়া রম্য বিতর্ক অচল। এ ছাড়া চলচ্চিত্র বা নায়ক-নায়িকা নিয়ে স্থুল ব্যঙ্গ ছাড়া রম্য বিতর্ক জনপ্রিয় করা কঠিন ।

বলা বাহুল্য, আজকাল যাঁরা রম্য বিতর্ক দেখছেন, তাঁদের অনেকের ধারণায় রম্য বিতর্কের পরিধি ও বৈশিষ্ট্য এ রকমই হওয়া উচিত। আসলে এ-জাতীয় নিছক প্রেম, চলচ্চিত্র, ব্যক্তি তথ্যের উল্লেখ বা স্কুল ব্যঙ্গনির্ভর রম্য বিতর্ক দিয়ে দ্রুত জনপ্রিয়তা পাওয়া যেতে পারে, কিন্তু তা সস্তা, দুর্বল, ক্ষণস্থায়ী এবং উদ্দেশ্যবিস্তৃত। এ ধারার বিপরীতে রম্য বিতর্ককে সমৃদ্ধ ও স্থায়ীভাবে জনপ্রিয় করার লক্ষ্যে অবশ্যই রম্য বিতর্কের পরিমণ্ডল দ্রুত সম্প্রসারিত হওয়া উচিত। রম্য বিতর্কে নির্দিষ্ট কোনো পরিমণ্ডল থাকা উচিত নয়, যৌক্তিকও নয়। এর পরিমণ্ডল হবে বিশ্বজনীন রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি, আইন, দর্শন তথা সবকিছুর মধ্যেই রম্য বিতর্ককে নিয়োজিত করা সম্ভব।

২. রম্য বিতর্কের প্রাণ:

সরাসরি রম্যের প্রাণ হচ্ছে রস বা হিউমার আর বিতর্কের প্রাণ হচ্ছে যুক্তি। অতএব, রস ও যুক্তির সংমিশ্রণই হচ্ছে রম্য বিতর্কের প্রাণ। সহজ কথায়, রসসমৃদ্ধ যুক্তিই হচ্ছে রম্য বিতর্কের প্রাণ। তবে এ ক্ষেত্রে আরেকটি বিতর্ক হতে পারে যে কোনটি বড় — যুক্তি না রস? প্রথাগত গুরুত্বপূর্ণ বা সিরিয়াস বিতর্কে অবশ্যই যুক্তির ওপর আর কিছু থাকতে পারে না। কিন্তু রম্য বিতর্কে দর্শকদের আকাঙ্ক্ষার বস্তু হলো নান্দনিক বিনোদন। সহজ কথায় তারা আনন্দ পেতে চায়। তাই রম্য বিতর্কে যুক্তির চেয়ে রস বড় হয়ে ওঠে। অনেক সময় রসের প্রাবল্যে যুক্তি পরিণত হয় ফ্যালাসিতে। ওটা যে যুক্তি নয়, এ ব্যাপারটা দর্শক আগেই বুঝতে পারে বলে তা ক্ষতিকর নয়। যেমন ধরা যাক একটি রম্য বিতর্ক হচ্ছে। বিষয়বস্তু “সুখ অন্বেষণ অনুচিত’।

পক্ষের বক্তা: সুখ একটি মরীচিকা। মরীচিকার পেছনে ধাবিত হওয়া অনুচিত। মধ্যযুগের বৈষ্ণব কবি এ জন্য যথার্থই বলেছেন, ‘সুখের লাগিয়া এ ঘর বাঁধিনু অনলে পুড়িয়া গেল / অমৃত সাগরে সিনান করিতে সকলি গরল ভেল।’ যে সুখের ঘরে আগুন লেগে যাবে, সে সুখের ঘর আমরা কেন বাঁধতে যাব? আমরা সুস্থ মানুষ, অন্তত জেনেশুনে এ রকম ভুল করতে পারি না ।

বিপক্ষের বক্তা : আমার বিপক্ষের বক্তা বললেন, ‘আমরা সুস্থ মানুষ। তাই জেনেশুনে ভুল করতে পারি না। তাহলে কি রবীন্দ্রনাথ অসুস্থ ছিলেন?

তিনি তো বলেছেন, ‘আমি জেনেশুনে বিষ করেছি পান। রবীন্দ্রনাথের মতো মানুষ জেনেশুনে বিষ পান করতে পেরেছেন, আর আমরা জেনেশুনে সুখের অন্বেষণ করব না, তা কী করে হয়? বিপক্ষ হয়তো বলবেন, ‘বিষের চিকিৎসা ছিল। সুখের পেছনে আপনারা যে আগুনের ভয় দেখাচ্ছেন, তার জন্য প্রতিটি শহরে রয়েছে ফায়ার সার্ভিস। এই ফায়ার সার্ভিসের ওপর ভরসা রেখে সুখের অন্বেষণ করা অবশ্যই উচিত।

এ ক্ষেত্রে দুজন বক্তা যেসব যুক্তি দেখিয়েছেন, সেগুলো কিন্তু মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়ানোর মতো যুক্তি নয়। সবই এসেছে সাহিত্যরসের অনুষঙ্গ হিসেবে। তা ছাড়া সাহিত্যের উদ্ধৃতিগুলোর প্রেক্ষাপটও পাল্টে গেছে। দর্শক ভালো করেই বুঝতে পারছেন যে রবীন্দ্রনাথ ‘বিষ’ বলতে ওই ইঁদুর মারার বিষ বোঝাননি, যা খেলে জীবন বাঁচানোর জন্য ডাক্তারি চিকিৎসার প্রয়োজন। স্রেফ নির্মল আনন্দের জন্যই এটা করা হয়েছে, অনেকটা কার্টুনের মতো। তাই রম্য বিতর্কের প্রাণ হচ্ছে রস এবং তার প্রয়োজনে উঠে আসা যুক্তি যা আসলে কী রকম যুক্তি’ তা দর্শক নিজেই বিচার করতে পারে।

 

রম্য বিতর্ক
রম্য বিতর্ক

 

৩. রম্য বিতর্কের ধারা:

কোন ধারায়, অর্থাৎ সংসদীয় নাকি সনাতনী নাকি জাতিসংঘ প্রভৃতি কোন মডেলে রম্য বিতর্ক হওয়া উচিত, তা নিয়ে আসলে কোনো বিতর্কের অবকাশ নেই। যেকোনো ধারায় এ বিতর্ক হতে পারে। তবে আমরা সাম্প্রতিক সময়ে যতগুলো রম্য বিতর্ক দেখলাম, সেগুলো হয়েছে সনাতনী ধারায়। এর কারণ হলো, রম্য বিতর্কের জন্য সনাতনী ধারা সুবিধাজনক। সংসদীয় ধারায় কিছু সুনির্দিষ্ট সংসদীয় নিয়মনীতি রয়েছে ।

যেমন পয়েন্ট অব অর্ডার, পয়েন্ট অব প্রিভিলেজ – যেগুলো নিয়ে রসিকতা করা যায় না। হয়তো আগে থেকে বলে নিয়ে এসব পয়েন্ট ভিত্তিক রসিকতা স্বীকার করতেও পারেন। সে ক্ষেত্রে বলা প্রয়োজন হবে, এ বিতর্কে স্পিকারের পদ অলীক। কিন্তু তারপরও সংসদীয় ধারা রম্য বিতর্কে কিছুটা অসুবিধা সৃষ্টি করবে। সেটি হলো মাঝখানে থামিয়ে দেওয়া, যা সংসদীয় বিতর্কে সম্ভব এবং এটি বক্তার রস সংগঠনে বিঘ্নকর।

ধরা যাক, একজন বক্তা বেশ কিছু কবিতার পক্তি এনে তারপর একটা রসের বার্তা দর্শককে দেবেন। ঠিক এর মাঝপথে কোনো পয়েন্ট তুলে তাঁকে থামিয়ে দিলে বক্তার রসভঙ্গ ঘটে এবং দর্শকও বঞ্চিত হয় । সিরিয়াস বিতর্কে এটা মেনে নেওয়া যায়। কারণ, তখন কে কাকে আটকাবে, এটিও বড় কৌশল হয়ে দাড়ায়। কিন্তু রম্য বিতর্কে ওরকম সাপে-নেউলে সম্পর্ক থাকে না। রম্য বিতর্ক যতটা না প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক, তার চেয়ে শত গুণ বেশি পারস্পরিক সহযোগিতামূলক। এখানে জয়-পরাজয়ের তেমন ঘোষণা থাকে না। থাকলেও তা আগে থেকে নির্ধারিত বা সম্প্রীতিমূলক। এসব কারণে রম্য বিতর্কের মডেল হিসেবে নির্বিঘ্ন মডেল তথা সনাতনী ধারাকে বেছে নেওয়া হয়।

৪. রম্য বিতর্কের উদ্দেশ্য :

শিল্পসাহিত্যের সব ধারাতেই কিছু না কিছু রমারস থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। খুব সিরিয়াস নাটকের পাশে কৌতুক নাটকের প্রয়োজনীয়তাও অনুভূত হয়। শুধু নাটক কেন—কবিতা, সংগীত, মুকাভিনয়, চিত্রকলা প্রভৃতি ক্ষেত্রে রমারসের অস্তিত্ব প্রবল। একজন সার্থক কথাশিল্পী রম্যরসের মধ্য দিয়ে সহজেই অনেক কঠিন বিষয় আমাদের কাছে পৌঁছে দেন। বিতর্কের মধ্যেও রম্য বিতর্ক এ রকম একটি ধারা, যা সভ্য দর্শক-শ্রোতাকে আনন্দ দেয়। এর প্রধান উদ্দেশ্য আত্মিক বিনোদন। তবে বিনোদনের বাহন হিসেবে অশ্লীলতা, ব্যক্তিকেন্দ্রিক স্কুল মশকরা, অসংলগ্ন তামাশা, ন্যাকামো এবং ইতরামো যেন রম্য বিতর্কে ঢুকে না পড়ে, সেদিকে বিতার্কিকের থাকতে হবে শাণিত দৃষ্টি ।

এই বিষয়গুলো এড়িয়ে সাহিত্যের বিভিন্ন উপাদান ব্যবহার করে বিতার্কিক কীভাবে দর্শক-শ্রোতাকে নির্মল আনন্দ দিতে পারেন, সেটি রম্য বিতার্কিকের মূল দক্ষতা প্রমাণ করে। রম্যের উদ্দেশ্য যে আনন্দ, তার মানে এই নয় পেটফাটা হাসি। একদম না হেসেও একজন শ্রোতা মনোজাগতিক আনন্দ লাভ করতে পারেন, যা তার অন্তরঘনিষ্ঠ বিনোদন বা নিজস্ব প্রশান্তি ঘটায়। টানা কঠিন বক্তৃতা বা সেমিনারের পর এ জন্যই রম্য বিতর্ক জুড়ে দেওয়া হয়, যা শ্রোতাকে দিতে পারে বিনোদন ও প্রশান্তি। মানবিক সত্তার সেরা অনুভূতি হচ্ছে তার জীবনবোধ, আর সাহিত্য হচ্ছে এই নিবিড় জীবনবোধের আলেখ্য। অতএব, সাহিত্য হচ্ছে মানবিক সত্তার সেরা সৃষ্টি। রম্য বিতর্কের প্রধান উপজীব্যই হচ্ছে সাহিত্য।

 

রম্য বিতর্ক
রম্য বিতর্ক

 

৫. রম্য বিতর্কের ভাণ্ডার:

রম্য বিতর্কের ভাণ্ডার হচ্ছে অফুরন্ত মানবসাহিত্য। তাহলে কি রম্য বিতার্কিক হতে হলে প্রত্যেককে হতে হবে বড় মাপের সাহিত্যিক? রম্য বক্তার সাহিত্যে ন্যূনতম দখল থাকতে হবে, জানতে হবে জনপ্রিয় সাহিত্যগুলো কী এবং তা থেকে আয়ত্ত করতে হবে দ্রুত গণযোগাযোগের ভাষা এবং নান্দনিক বিনোদন দেওয়ার কৌশল। সাহিত্যিক হতে হবে এমন বাধ্যবাধকতা নেই, তবে সাহিত্য জানাই রম্য বিতর্কে সাফল্যের জন্য বড় কথা । প্রাবন্ধিক এল এ জি স্ট্রং তাঁর ‘রিডিং ফর প্লেজার’ প্রবন্ধে দেখিয়েছেন যে আনন্দের মধ্য দিয়ে পড়া অধিক ফলোৎপাদক।

মানুষের এই অন্তর্নিহিত মনস্তাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যের কারণে আনন্দদায়ক শিল্প ও সাহিত্যকর্মগুলো বেশি জনপ্রিয়। শরত্চন্দ্র সমাজকে নিয়ে অনেক কঠিন কথা বলেছেন, কশাঘাত করেছেন। কিন্তু রস ও শ্লেষের মধ্য দিয়ে এগুলো প্রকাশিত হওয়ায় তা মনের মধ্যে গেঁথে রয়েছে। শ্রীকান্ত (১ম পর্ব) উপন্যাসে তিনি বলেছেন, ‘মশার কামড় সহা করিতে না পারিয়া সন্ন্যাসীগিরিতে ইস্তফা দিয়াছি।’ কবি নজরুলকে নিয়ে কবি গোলাম মোস্তফা রমা করেছিলেন

কাজী নজরুল ইসলাম
বাসায় একদিন গিছলাম
ভায়া লাফ দেয় তিনহাত
হেসে গান গায় দিনরাত ।

তার উত্তরে কবি নজরুল খুব সংক্ষিপ্ত ভাষায় বুদ্ধিদীপ্ত রস করেছিলেন, গোলাম মোস্তফা, দিলাম ইস্তফা।’ অর্থাৎ তিনি আমার ভাবনার বিষয় নন, কিংবা তাকে নিয়ে ভাবনা বাদ দিলাম ।

রম্য বিতর্কে এ বিষয়টি খুবই লক্ষণীয় যে জবাব যেন সংক্ষিপ্ত অথচ খুবই বুদ্ধিদীপ্ত ও রসাল হয়। গান্ধীজিকে একবার তাঁর ভক্তরা জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী ব্যাপার, আপনি থার্ড ক্লাসে এলেন যে!’ গান্ধীর উত্তর ছিল, “ফোর্থ ক্লাস নেই বলে।’ রবীন্দ্রনাথের ‘ভারততীর্থ’ কবিতার একটি শ্লেষাত্মক ও রম্য জবাব দিতে গিয়ে নজরুল বলেছিলেন:

এই ভারতের মহামানবের সাগর তীরে হে ঋষি
তেত্রিশ কোটি বলির ছাগল চরিতেছে দিবানিশি।

নিজেদের নিয়ে অযথা গর্ব করায় বিশ্বাসী ছিলেন না নজরুল। তিনি আরও লিখেছেন

বাহিরের দিকে মরিয়াছি যত ভিতরের দিকে তত
গুণতিতে মোরা বাড়িয়া চলেছি গরু ছাগলের মতো।

জনসংখ্যা নিয়ে যাঁরা গর্ব করেন কিংবা বলেন “বিশ্বের মধ্যে আমরা অততম জাতি’, তাদের উদ্দেশে নজরুলের এই রসাত্মক পংক্তিদ্বয় হচ্ছে এক উৎকৃষ্ট জবাব । আমরা সামান্য ব্যাপার নিয়ে যার যার পাণ্ডিত্য ফলাতে ব্যাকুল হয়ে যাই। বাঙালির এই গুণকে রবীন্দ্রনাথ তার ‘হিং টিং ছট’ কবিতায় ব্যঙ্গ করেছেন

ত্রয়ী শক্তি ত্রম্বরূপে প্রপঞ্চে প্রকট
সংক্ষেপে বলিতে গেলে হিং টিং ছট।

মহাকবি শেকসপিয়ার একজন কালজয়ী নাট্যকার। কার্ল মার্ক্সের ভাষায়, ‘শেকসপিয়ারের নাটকগুলো হচ্ছে জৈবনিক উপলব্ধির এক একটি বাইবেল। এই নাট্যকার তাঁর ‘টেমিং অব দ্য শ্রু’ কিংবা ‘এ মিড সামার নাইটস ড্রিম’ নাটকে যে বক্তব্য উপস্থাপন করেছেন, সেখানেও রম্যরসের প্লাবন ।

রম্যরসের সার্থক কৌশল হচ্ছে শব্দে একটা বলা আর আসল অর্থে তার উল্টোটা বোঝানো। এ ক্ষেত্রে রম্য সাহিত্যিক সুকুমার রায়ের রচনা যেন অতুলনীয়। পাত্রের বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেছেন

গঙ্গারাম তো পাত্র ভালো
রং যদিও বেজায় কালো।
কিন্তু তাদের উচ্চঘর
কংস রাজার বংশধর।

এই ‘সুপাত্র’ গঙ্গারাম উনিশবার মেট্রিক ফেল করে থেমেছে। এ ক্ষেত্রে সুকুমার রায় যখন তার অধ্যবসায়ের প্রশংসা করেন, তখন তা রস, শ্লেষ আর বিদ্রূপের এক অপূর্ব সমন্বয় ঘটায়। এই সমন্বয় ঘটানোর ব্যাপারটি বক্তার দক্ষতার ওপর নির্ভর করে। স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় আমরা স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অনেক কিছু শুনলেও এম আর আখতার মুকুলের ‘চরমপত্র’ ছিল বেশ জনপ্রিয়। কারণ, এটিতে রস, শ্লেষ আর বিদ্রূপ এক আনন্দপ্রদ অনুপাত মিশ্রিত হয়ে পরিবেশিত হতো। উপরন্তু মুক্তিকামী মানুষকে এটি উদ্বুদ্ধ করত। মধ্যযুগের কবি ভারতচন্দ্র তাঁর অন্নদামঙ্গল কাব্যে রম্য সাহিত্যের এক অপূর্ব কৌশল দেখিয়েছিলেন। সেখানে তিনি নায়িকা দুর্গার মুখ দিয়ে শিব সম্বন্ধে বলেছেন এক কথা, অথচ প্রকৃত অর্থে তা বোঝাচ্ছে অন্য কথা ।

বিশেষণে সবিশেষ কহিবারে পারি
জানহ স্বামীর নাম নাহি ধরে নারী
অতি বড় বৃদ্ধ পতি সিদ্ধিতে নিপুণ
কোনো গুণ নাই তার কপালে আগুন।

একপর্যায়ে দুর্গা গালি দিয়ে পাটনীর সামনে বলছে, ‘না মরে পাষাণ বাপ দিলা হেন বরে। এখানে দুর্গার পাষাণ বাপ মানে হিমালয় আর না মরে’ অর্থ হচ্ছে ‘শিব অমর’।

এখানে ভারতচন্দ্র লিখিত ‘গঙ্গাপতি’ বর্ণনায় প্রকৃত অর্থ আক্ষরিক অর্থের উর্ধ্বে উঠে গেছে আর সুকুমার রায়ের গঙ্গারাম বর্ণনায় প্রকৃত অর্থ ওপরে উঠুক আর নিচে নামুক, আসল কথা হচ্ছে রম্য বিতর্কের বক্তাকে জানতে হবে কীভাবে প্রকৃত অর্থ ও আক্ষরিক অর্থের মধ্যে এক সাফল্যজনক বিভাজন ঘটানো যায় এবং রসাত্মক ভাষায় তা প্রয়োগ করা যায়। ড ভূপেন হাজারিকা যখন তাঁর গানের মধ্যে বলেন, ‘আমায় ভুল বুঝিস না, মাইয়া ভুল বুঝিস না’, তখন সেখানেও থাকে রম্য। বোঝা যায় আসলেই ভুল বুঝতে হবে। শক্তি চট্টোপাধ্যায় যখন বলেন, ‘অবশেষে পুলিশ ও গাহিলো রবীন্দ্রসংগীত’, তখন তার মধ্যে প্রাণবন্ত থাকে রস, যাকে নানাভাবে ব্যাখ্যা করা যায়।

আবুল মনসুর আহমদ একজন সার্থক রস সাহিত্যিক। তাঁর ‘আয়না’, ‘ফুড কনফারেন্স’, ‘হুজুর কেবলা’, ‘রিলিফ ওয়ার্ক’ প্রভৃতি রচনায় তিনি রস, শ্লেষ ও বিদ্রূপের উদ্দেশ্য সফল সংমিশ্রণ ঘটিয়েছেন। রাজশেখর বসু বা পরশুরাম, শিবরাম চক্রবর্তী, সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায় প্রমুখের রচনায় সাহিত্যরস প্রবল। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ রচিত লালসালু কি একটি সিরিয়াস উপন্যাস? অবশ্যই। কিন্তু সিরিয়াস বক্তব্যও মূর্ত হয়েছে লেখকের শ্লেষাত্মক রসবোধসম্পন্ন ক্ষমতার মধ্য দিয়ে।

অধ্যাপক মমতাজ উদ্দীন আহমদের রস রচনা, রনবীর কার্টুন, চার্লি চ্যাপলিনের বাক্যব্যয়, লুৎফর রহমান রিটনের ছড়াসাহিত্য—এসবের মাঝ থেকে একজন রম্য বিতার্কিক প্রতিদিনই কিছু না কিছু আহরণ করেন। এভাবে একজন রম্য বিতার্কিক সংশ্লিষ্ট সাহিত্যের রূপ, রস ও গন্ধ থেকে নিজেকে সমৃদ্ধ করতে পারেন । ছোট ছোট ঘটনাও রম্যের আধার হতে পারে।

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল ও নাট্যকার উপন্যাসিক জর্জ বার্নার্ড শ পরস্পর বন্ধু ছিলেন। রসিকতাও ছিল তাঁদের প্রবল। বার্নার্ড শ চার্চিলকে নিমন্ত্রণপত্র পাঠালেন, আমার নাটকের প্রথম প্রদর্শনীতে এসো। দুটো কার্ড পাঠালাম। তোমার কোনো বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে এসো – অবশ্য যদি আদৌ তোমার কোনো বন্ধু থাকে। উত্তরে চার্চিল লিখেন, দুঃখিত। ওই সন্ধ্যায় আমার একটি গুরুত্বপূর্ণ মিটিং আছে, যেতে পারব না। তবে ওই নাটকের দ্বিতীয় প্রদর্শনীতে যাবার ইচ্ছে রইল। অবশ্য তোমার নাটকের আদৌ যদি কোনো দ্বিতীয় প্রদর্শনী হয়। দুজনের ওই রম্যের মধ্যে উঁচুমার্গের বুদ্ধি ও রসিকতা কাজ করেছে। এতে বন্ধুত্ব বাড়ে বৈ কমে না ।

 

৬. রম্য বিতর্কের বিষয় :

আগেই বলা হয়েছে, রম্য বিতর্ককে নির্দিষ্ট পরিমণ্ডলে আবদ্ধ করা সম্ভব নয়। তবু গত কয়েক বছরে আমরা রম্য বিতর্কের যেসব বিষয়ের সঙ্গে পরিচিত হয়েছি, তার কয়েকটি এখানে তুলে ধরা হলো, যা বক্তার ধারণা গঠনে সহায়ক হতে পারে।

ক) ত্রিশোর্ধ্ব বয়সই জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়

খ) বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনে শিক্ষকদের চেয়ে ছাত্ররাই বেশি সুখী

গ) দিনের চেয়ে রাত ভালো

ঘ) ফুলের চেয়ে পাতা ভালো

ঙ) জীবনসাথি নির্বাচনে অভিভাবকের হস্তক্ষেপ মানবাধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন

চ) প্রেমের চেয়ে বিরহ মধুর

ছ) চিত্তের চেয়ে বিত্ত বড়

জ) অর্থের চেয়ে অন্তরের ডাক প্রবল

ঝ) এ যুগে বই অচল

ঞ) এ যুগে কবিতার প্রয়োজন ফুরিয়ে গেছে

ট) প্রেমে লাভের চেয়ে লোকসানই বেশি

ঠ) বিবাহ প্রেমের সূর্যাস্ত

ড) পৃথিবীতে সুন্দর দিনগুলো এখনো আসেনি

ঢ) দানের চেয়ে গ্রহণ মধুর

ওই বিষয়বস্তুগুলোতে প্রেম প্রসঙ্গ প্রাধান্য পেলেও রম্য বিতর্কের ক্ষেত্রে এ বিষয়ে কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।

৭. জগতে আনন্দ যজ্ঞে :

রম্য বিতর্কের উদ্দেশ্য হচ্ছে আনন্দ এবং আনন্দের সঙ্গে কিছু শেখা, জীবনবোধ ও সাহিত্যের সঙ্গে পরিচিত হওয়া। রম্য বিতার্কিক তাই কখনো কথায়, কখনো কবিতায়, কখনো গানে এবং কখনো অভিনয়ে তাঁর ভাব প্রকাশ করেন। একটি রম্য বিতর্কের জন্য এটিই স্বাভাবিক।

অর্থাৎ, রম্য বিতর্ক একই সঙ্গে বক্তার অনেকগুলো গুণের চর্চা ঘটায় এবং গান, কবিতা, অভিনয় প্রভৃতি বিভিন্ন শিল্পমাধ্যমের দ্বারা দ্রুত দর্শক-শ্রোতার অন্তরে প্রবেশ করতে পারে। এভাবে নির্মল উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে মানুষের মধ্যে আনন্দ সঞ্চারিত করা মানবজীবনকে ধন্য করার এক অন্যতম ব্রত। তাই একজন রম্য বিতার্কিক জগতে আনন্দ যজ্ঞে’ অংশগ্রহণের নিমন্ত্রণে এক সাড়াদাতা শিল্পরসিক মানুষ।

Leave a Comment