আজকে আমরা আলোচনা করবো বিতর্কের সংসদ মডেল

বিতর্কের সংসদ মডেল
গণতন্ত্রের পাঠশালা
হালে সবচেয়ে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে বিতর্কের সংসদ মডেল (Parliament Model) বা এককথায় সংসদীয় বিতর্ক। ব্রিটেনের সরকার সংসদীয় ধারার। তাদের সংসদে প্রচলিত বিতর্কের আদলে এই ধারা চলমান। অন্যান্য মডেলের অধিকাংশই মৌলিক চিন্তার ফল-এ জন্য ওগুলো এখনো পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর্যায়ভুক্ত। কিন্তু সংসদ মডেল যথেষ্ট তৈরি ও প্রচলিত বিষয়। এর চর্চার ইতিহাস দীর্ঘদিনের। এ রচনায় সংসদীয় ধারার আলোচনা আসলে প্রচলিত নিয়মগুলোর উপস্থাপনমাত্র।
সংসদে যেমন সরকারি ও বিরোধী দল কোনো পূর্ব নির্ধারিত বিষয় নিয়ে তর্কে লিপ্ত হয়, এটিও তার আদলে গড়া। স্পিকার এই তর্কের আসর পরিচালনা করেন । দুই দিকের দুই দলপতি হচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেতা। আরও দুজন মন্ত্রী থাকছেন সংসদ নেতা তথা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে। তাঁদের দপ্তর বিষয়বস্তুর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলে ভালো।
যদি তর্কের বিষয় হয় এই সংসদ মনে করে যে জনতার সাংস্কৃতিক জাগরণের স্বার্থে টিভিতে সংস্কৃতিবিষয়ক অনুষ্ঠানমালা বাড়াতে হবে। এ ক্ষেত্রে সংস্কৃতিমন্ত্রী ও তথ্যমন্ত্রী অন্তর্ভুক্ত হবেন প্রধানমন্ত্রীর সরকারি দলে। বিরোধী দলেও সংস্কৃতি ও গণমাধ্যমবিষয়ক ছায়ামন্ত্রী বা উপদেষ্টাবৃন্দ বিরোধী নেতার সঙ্গে যুক্ত হবেন।
এ মডেল জনপ্রিয় হওয়ার কিছু কারণ আছে। এ বিতর্ক দেখলে মনে হয় যেন সংসদে বসে আছি। সবার সংসদে যাওয়ার সুযোগ বা ভাগ্য হয় না। তাঁরা বুঝে নেন সংসদের ভেতরে কীভাবে কথা-কাটাকাটি হয়। আজ টিভির কল্যাণে সংসদীয় অধিবেশন সরাসরি প্রচার করা হয়, যদিও বিতর্কের অনেক উপাদান এগুলোতে অনুপস্থিত থাকে। এর প্রিয়তার অন্যতম কারণ হচ্ছে তিন ধরনের ‘পয়েন্ট’ উত্থাপনের সুযোগ, যা এ বিতর্কধারাকে বেশিমাত্রায় পারস্পরিক অংশগ্রহণমূলক ও উদ্দীপক করে তোলে। তবে এদের অতিরিক্ত প্রয়োগ তর্কের গতিশীলতা কমায় এবং মূল আলোচনার বিচ্যুতি ঘটায়। লবণ খাদ্যের স্বাদ বাড়ায়, তবে বেশি লবণ রক্তচাপ বাড়িয়ে জীবনের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। পয়েন্টের সুযোগ থাকায় এ বিতর্কের দ্বন্দ্ব প্রবণতা বা ‘ইন্টারঅ্যাকশন’ বেশি থাকে।

এ বিতর্ক সংসদীয় গণতন্ত্রচর্চার বিদ্যালয়। শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভবিষ্যতে তুখোড় সাংসদ হওয়ার এ যেন এক অগ্রিম প্রস্তুতির কর্মশালা। বাংলাদেশে সংসদ সদস্যদের গড় বয়স সত্তরের ওপর (২০১৭)। এখানে ব্যবসায়ীদের আধিক্য । এ দুটো তথ্যের কোনোটিই সুখকর নয়। যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটর ও গণপ্রতিনিধিরা প্রায় সবাই রাজনীতিক ও সমাজকর্মী। তাঁদের শিক্ষাগত যোগ্যতার ভিত্তি হচ্ছে মূলত আইনশাস্ত্র, অর্থনীতি, সরকার ও রাজনীতি, প্রশাসন, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও ব্যবস্থাপনা।
আমাদের সংসদে উচ্চশিক্ষিত তারুণ্যের আগমন বাড়া উচিত। দক্ষ তার্কিকদের আগমন ভবিষ্যতে সংসদকে আরও প্রাণবন্ত করবে। এ লক্ষ্যে সংসদীয় বিতর্কের চর্চা বাড়ানো প্রয়োজন। এ জন্য ব্রিটিশ আদলের সংসদীয় গণতন্ত্র রয়েছে এ রকম দেশে, বিশেষত কমনওয়েলথভুক্ত দেশে, বিতর্কের সংসদ মডেল বহুল প্রচলিত ।
এ বিতর্কের মঞ্চবিন্যাস দুভাবে করা যেতে পারে। মাঝে বসেন স্পিকার। তাঁর দুপাশে দুজন করে মোট চারজন বিচারক বসতে পারেন। বিচারকদের সান্নিধ্য স্পিকারের জন্য, বিশেষত বিভিন্ন পয়েন্টবিষয়ক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়ক হতে পারে। সামান্য দূরত্বে হাতের ডান পাশে সরকারি দল ও বাম পাশে বিরোধী দল বসবে। প্রচলিত সংসদের বিন্যাস এখানে মানা যায় না, কারণ ওখানে স্পিকার ও সাংসদগণ মুখোমুখি বসেন। এখানে দর্শক-শ্রোতার মুখোমুখি বসেন সবাই।

সমস্ত বিতর্ক আসরটি দুভাগে বিভক্ত গঠনমূলক ও খণ্ডনমূলক। গঠনমূলক বক্তব্যের শুরুতে প্রথমে প্রধানমন্ত্রী সংসদে বিতর্কের বিষয় তথা ‘বিল’ উত্থাপন করেন। উদাহরণস্বরূপ সংস্কৃতিবিষয়ক পূর্বোল্লেখিত বিষয়ের কথা বলা যায়। এরপর বিরোধী নেতা কথা বলেন। তারপর মন্ত্রী ১. ছায়ামন্ত্রী ১. মন্ত্রী ২, ছায়ামন্ত্রী ২-এই অনুক্রম মানা হয়। খণ্ডনমূলক পর্বে প্রথমে আসেন বিরোধী নেতা এবং বিতর্ক সমাপ্ত করেন প্রধানমন্ত্রী।
পয়েন্ট বা আপত্তিগুলো তিন রকম
১. পয়েন্ট অব অর্ডার বা রীতি আপত্তি :
বিতর্কের নীতি ভাঙলে এ ধারা উত্থাপন করে স্পিকারের কাছে আবেদন করা যায়। যেমন নিয়মে আছে খণ্ডনমূলক পর্বে কোনো নতুন যুক্তি বা বক্তব্য উত্থাপন করা যাবে না। উত্থাপিত আপত্তি গৃহীত হলো কি হলো না তার সিদ্ধান্ত দেবেন স্পিকার।
২. পয়েন্ট অব ইনফরমেশন বা তথ্য আপত্তি :
কেউ ভুল তথ্য দিলে প্রতিপক্ষ এ ধারা উত্থাপন করতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে আপত্তি উত্থাপনকারী সাংসদের জানা থাকা বাঞ্ছনীয় যে সঠিক তথ্যটি কী৷ বক্তৃতারত সাংসদ ঠিক করবেন তিনি এই তথ্যবিষয়ক আপত্তি গ্রহণ করবেন কি না ।
৩. পয়েন্ট অব পারসোনাল প্রিভিলেজ বা ব্যক্তি সম্ভ্রম আপত্তি :
কোনো বক্তব্যে কাউকে ব্যক্তিগতভাবে হেয় করলে সংক্ষুব্ধ সাংসদ এ আপত্তি উত্থাপন করতে পারবেন। এটিও গ্রহণ করা বা না করা স্পিকারের বিবেচনাপ্রসূত।
এ ছাড়া রয়েছে হেকলিং (Heckling) বা টিপ্পনী কাটার সুযোগ। সেটা মূল বক্তব্যকে বেশি বিঘ্নিত করলে বিচারকেরা টিপ্পনীরত সাংসদের ওপর বিরক্ত হতে পারেন, যা তার নম্বরপত্রেও প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ মূল লক্ষ্য হচ্ছে একটা সুন্দর, সুস্থ ও সাবলীল গতিসম্পন্ন বিতর্ক কোনো টিপ্পনী বা আপত্তিমুখর আড্ডা নয়। তবে সাংসদগণ টেবিল চাপড়িয়ে স্বপক্ষের বক্তাকে উৎসাহিত করবেন, এটা প্রত্যাশিত এবং তর্কের উদ্দীপনা সঞ্চারক। এতে কারও নেতিবাচক মনোভাব নেই । এখানে কিছু বডি ল্যাংগুয়েজ বা শরীরী অভিব্যক্তির সুযোগ আছে, যা অন্য অধিকাংশ মডেলে নেই বা কম। সম্মতি বা সমর্থনসূচক ঊর্ধ্ব অধঃ মাথা নাড়ানো কিংবা মেনে না নেওয়া বা এটি মিথ্যা—এ রকম বুঝিয়ে আনুভূমিক মাথা নাড়ানো এ বিতর্কে চলতেই থাকে।

সংসদীয় বিতর্কের মূলকথা বলা হয়ে গেছে। এবার আনুষঙ্গিক কিছু নিয়মের উল্লেখ প্রয়োজন।
১. বিতর্ক শুরুর এক মিনিট আগে এবং বিতর্ক শেষ হওয়ার এক মিনিট থাকতে কোনো তথ্য আপত্তি তোলা যাবে না।
২. সময়ের বণ্টন নানাভাবে করা যায়। যেমন প্রধানমন্ত্রীর বিল উত্থাপন ৫ মিনিট । বিরোধী নেতাসহ সবাই ৬ মিনিট করে কথা বলবেন গঠনমূলক পর্বে। খণ্ডন শুরু হলে বিরোধী নেতা ২ মিনিট ও প্রধানমন্ত্রী ৩ মিনিট সময় পাবেন । অর্থাৎ মোট সময় এই দুই নেতার জন্য একই থাকল, শুধু বিন্যাসটা ভিন্ন। উত্থাপনের সময় প্রতিপক্ষের কোনো বক্তব্য মাথায় থাকে না বলে সংসদ নেতা তখন সময় কম নিতে পারেন, যা খণ্ডনপর্বে পাওয়া গেলে বক্তা সুবিধা নিতে পারেন।
৩. পয়েন্ট অব অর্ডার গৃহীত হলে উত্থাপনকারী শুধু তা উল্লেখ করতে পারবেন, কিন্তু আরও যুক্তি জোড়া দিতে পারবেন না। তখন অভিযুক্ত বক্তা সংক্ষেপে এর জবাব দিতে পারবেন। স্পিকার তখন তাৎক্ষণিকভাবে তিনটি সিদ্ধান্তে ‘রুল’ দিতে পারবেন ক আপত্তি গৃহীত, খ. অগৃহীত, গ. আপত্তিটি বিবেচনাধীন।
৪. খুব সুস্পষ্ট বা জোরালো না হলে পয়েন্ট অব অর্ডার উত্থাপন অনুচিত।
৫. পয়েন্ট-সংক্রান্ত কথাবার্তায় ব্যয়িত সময় বক্তার জন্য প্রদত্ত ন্যায্য সময় থেকে বিয়োগ করা হবে না। অর্থাৎ যতক্ষণ আপত্তি-সংশ্লিষ্ট কথাবার্তা চলবে ঠিক ততক্ষণ সময় চলমান বক্তার সময় বাজেটে যুক্ত হবে। সম্ভ্রম আপত্তির বেলায়ও একই সময় হিসাব প্রযোজ্য।
৬. সম্ভ্রম আপত্তি তখনই তোলা যাবে যখন এটা স্পষ্ট হবে যে চলমান বক্তা প্রতিপক্ষের যে কারও প্রতি সম্ভ্রমহানিকর মন্তব্য বা ইঙ্গিত করেছেন। রুচিহীন মন্তব্য করলেও এটি তোলা যাবে। প্রতিপক্ষের বক্তব্যের চরম অপব্যাখ্যা ঘটালেও এ আপত্তি তোলা যাবে। স্পিকার আপত্তির গ্রহণযোগ্যতা নির্ধারণ করবেন।
৭. ভিত্তিহীন বা কথার গতিবিঘ্নতা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে উত্থাপিত সম্ভ্রম আপত্তির জন্য উত্থাপক শাস্তিও পেতে পারেন। কমে যেতে পারে তার নম্বর।
৮. কমপক্ষে দুএক ঘণ্টা আগে সংসদ বিল বা প্রস্তাব দুই পক্ষকে দিয়ে দেওয়া বাঞ্ছনীয়। দুদল আলাদা আলাদা কক্ষে বা স্থানে প্রস্তুতি নেবে।
৯. সংসদ কক্ষে প্রবেশের সময় সঙ্গে শুধু সাদা কাগজ ও পয়েন্ট লিখিত কাগজ ছাড়া অন্য কোনো মুদ্রিত কাগজ নেওয়া যাবে না।
১০. বিষয়গুলো রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণমূলক হওয়া উচিত। রম্য বা হাস্যরসাত্মক বিতর্ক সংসদীয় ধারায় বেমানান। সবচেয়ে ভালো হয় চলমান আর্থসামাজিক নীতিবিতর্ক বা সংসদে চলছে বা গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে আলোচিত হচ্ছে—সংসদে তার ওপর তর্কচর্চার প্রস্তাব উত্থাপন করা ।
১১. এর বিষয়গুলো হতে পারে এ রকম
ক) মানোন্নয়নের স্বার্থে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্রদের বার্ষিক ফি বাড়ানো উচিত।
খ) গ্রাম্য সমাজের বাস্তবতা আমলে নিয়ে বিয়ের কোনো ন্যূনতম বয়স থাকা উচিত নয় ।
গ) স্বাস্থ্যবিমা সবার জন্য বাধ্যতামূলক করা উচিত।
ঘ) প্রাথমিক শিক্ষা পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্তই নির্ধারিত হওয়া উচিত।
ঙ) বার্ষিক উন্নয়ন পরিকল্পনা বার্ষিক বাজেটের কাঠামোতে থাকা উচিত নয়।
চ) রাজস্ব আদায়ের উন্নয়নে নতুন একটি রাজস্ব মন্ত্রণালয় করা উচিত।
১২. স্পিকার ছাড়া আর কাউকে সম্বোধন করা যাবে না। বক্তাকে লক্ষ রাখতে হবে যেন সম্বোধনের সংখ্যা মাত্রাতিরিক্ত না হয়। একজনের পুরো বক্তব্যে তিন-চারবারের বেশি সম্বোধন দুর্বল প্রস্তুতি, বাচালতা বা মুদ্রাদোষের শামিল।
১৩. পক্ষের বক্তাগণ খেয়াল রাখবেন তাঁরা যেন কোনো অবস্থাতেই প্রধানমন্ত্রীর মূল বক্তব্য থেকে বিপথে চলে না যান। বিরোধী পক্ষ কোনো না কোনো দিক থেকে আক্রমণ করবে—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু পক্ষের সাংসদদের ‘রেললাইন’ বরাবর চলতে হবে। মূল প্রস্তাবকে শক্তিশালী করতে হবে। কোনোরূপ বিচ্যুতি না ঘটিয়েই।
১৪. বিচারকগণ যে কয়টি বিষয়ের ওপর নম্বর দেবেন সেগুলো হলো ১. বক্তব্য উপস্থাপন, ২. যুক্তি-তথ্যপ্রমাণ, ৩ দল সমন্বয়, ৪. ভঙ্গি ও সৌজন্য, ৫ খণ্ডনক্ষমতা, ৬. সংসদীয় রীতিবিষয়ক জ্ঞান, ৭. সামগ্রিক বক্তব্য খণ্ডন ও সামগ্রিকতায় দশ করে দিয়ে এবং বাকি বিষয়ে পাঁচ করে দিয়ে মোট ৫০ নম্বরের মধ্যে বিচার হতে পারে।
১৫. যেহেতু আসল সংসদে সবশেষে ভোট হয়, এ বিতর্কেও ভোট গণনা চূড়ান্ত রায় দিতে পারে। নম্বর গ্রহণ ও বিচারকদের ভোট পাশাপাশি নেওয়া যায়। ধরা যাক, চারজন বিচারক ২ ২ ভোটে বিভক্ত হয়ে গেলেন । তখন স্পিকার নির্ধারণী ভোট দিয়ে বিজয়ী নির্ধারণ করবেন। নম্বর শুধু ব্যবহৃত হবে শ্রেষ্ঠ বক্তা নির্ধারণের প্রয়োজনে ।
এই নিয়মগুলোর যথার্থ প্রয়োগে সংসদীয় বিতর্ক হয়ে ওঠে প্রাণবন্ত তর্কচর্চা ও শিক্ষার আসর এবং তা নিশ্চিত করে তোলে ভবিষ্যতের গণতান্ত্রিক নেতৃত্বের সাফল্য।
