আজকে আমাদের আলোচনার বিষয়ঃ বিতর্কের কাব্য মডেল

বিতর্কের কাব্য মডেল
কবিতায় তর্কযুদ্ধ
পয়ারের ছন্দ অথবা আধুনিক কবিতার ধাঁচে তর্কচর্চার নাম বিতর্কের কাব্য মডেল (Lyric Model)। এতে মিত্রাক্ষর ছন্দবোধ ও প্রত্যুৎপন্নমতির সাক্ষ্য পাওয়া যায় কাব্যবোধের আশ্রয়ে। এতে আবৃত্তির অনুশীলনও হয়ে যায় পদ্যযুদ্ধের আশ্রয়ে। আধুনিক কবিতা নাকি কৃত্তিবাসী পয়ার ছন্দ এখানে থাকবে তা নির্ভর করছে বক্তার ওপর। মিশ্রণেও রস লাঘবের আশঙ্কা নেই। এখানে প্রয়োজন কাব্য অনুভূতির চারটি প্রাণ, যাদের নাম হতে পারে ১) কবি চন্দ্র ২) কবি সূর্য ৩) কবি বিশ্ব ও ৪) কবি নক্ষত্র।
পরিচালনায় থাকবেন সভা কবি অথবা কবি রাজ। আগের দিনে রাজার সভায় এমন কবিদের লড়াই হতো। তারই এক আধুনিক সংস্করণ এই কাব্য তর্ক। সভার বিন্যাস হবে এরূপ

কাব্য তর্কের নিয়মাবলি
১. প্রথমে কবি রাজ সভা আহ্বান করবেন এবং একটি কাব্যিক বিষয়বস্তু ঘোষণা করবেন।
২. অন্তত দুই ঘণ্টা আগে বিষয় পাওয়া প্রয়োজন।
৩. কবি চন্দ্র ও কবি সূর্য পক্ষের বক্তা বটে, তবে কাব্যিকতার চাপের কারণে এখানে প্রথম বা দ্বিতীয় বক্তা বলে কিছু নেই। পক্ষের যে কেউ বিপক্ষের কবি বিশ্ব বা কবি নক্ষত্রের কথার উত্তর দিতে পারবেন।
৪. পক্ষের প্রথম বা দ্বিতীয় বক্তা বলার পর বিপক্ষের প্রথম বা দ্বিতীয় যে কেউ প্রথমে বলতে বা উত্তর দিতে পারেন।
৫. এক কবি বিপক্ষ দলীয় আরেক কবিকে এমনকি নির্দিষ্ট করে প্রশ্ন ছুড়ে দিতে পারেন। তবে প্রশ্নবিদ্ধ কবি উত্তর নাও দিতে পারেন। উত্তর দিতে পারেন তারই সহ-কবি।

৬. নম্বরপত্র রচিত হবে যে বিষয়াবলির সমন্বয়ে তা হলো
ক) উপস্থাপন ও বাচন (১০)
খ) কাব্যক্ষমতা (২০)
গ) বিষয়বস্তু, তথ্য ও দৃষ্টান্ত (২০)
ঘ) খণ্ডনক্ষমতা (২০)
ঙ) দলের সমন্বয় ও নেতৃত্ব (২০) ও
চ) সার্বিক বিবেচনা (১০)
এভাবে মোট ১০০ নম্বরের ভিত্তিতে প্রত্যেকে কাজ করবেন ।
৭. অন্য কবিদের উদ্ধৃতি দেওয়া যাবে। তবে তা যেন নিজের কাব্যপরিসরকে আচ্ছন্ন করে না ফেলে ।
৮. প্রত্যেকে এক মিনিট/দুই মিনিট করে বলে বিশ থেকে ত্রিশ মিনিটের মধ্যে আসর শেষ করবেন। কবি রাজ মিনিট পাঁচেক সমাপনী ভাষণ দেবেন, যেখানে কাব্যিকতা থাকা বাঞ্ছনীয়।
৯. একবার এক পক্ষ পদ্য শেষ করলে একই পক্ষের বক্তা আর বলতে পারবেন না। বিপক্ষ বক্তা বলার পরই আবার তিনি বলবেন।
১০. সবশেষে কবি রাজ উভয় পক্ষ থেকে একজনকে সমাপ্ত পদ্য নিবেদন করতে বলবেন। কিন্তু তা নির্দিষ্ট করে বলবেন না। সমাপ্ত পদ্যে উভয় পক্ষ থেকে এক থেকে দুই মিনিট করে সময় পাবেন ।
১১. বিজয়ী দল ও কবি শ্রেষ্ঠকে পুষ্পমাল্যে ভূষিত করা যেতে পারে।
১২. কাব্যিকতার তরি বেয়ে যেন বস্তুনিষ্ঠ যুক্তির সাক্ষাৎ মেলে—সেটাই কাব্য তর্কের লক্ষ্য।
কাব্য বিষয়ের নমুনা
১. কবিতার কথা কেউ রাখে না গো মনেতে,
কবিতার প্রয়োজন আর নেই জগতে।
২. যুদ্ধ মানে অশান্তি নয় যুদ্ধ মানে মুক্তি,
যুদ্ধ মানে নতুন করে জীবন শুরু চুক্তি।
৩. অর্থনীতি ভালো হলে রাজনীতিও ভালো হবে।
মাথাপিছু আয় বাড়ানো সবার আগে ভাবতে হবে।
৪. বাংলাদেশের সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে পর্যটনে
বাড়ছে না তা আসল কারণ মানুষ আছে অনটনে।
৫. কবি থাকেন কাব্য নিয়ে,
প্রেম চলে যায় পাশ কাটিয়ে।
৬. গ্রামের চেয়ে শহর ভালো,
সেখানে আছে অনেক আলো।
৭. মাথাপিছু আয় বেড়েছে আগের চেয়ে ধনী।
বাঙালিরা আগের চেয়ে অনেক বেশি গুণী।
৮. কবিতার কথা ছিল হৃদয়ের ব্যাপ্তি
কবিতা পারেনি দিতে হৃদয়ের দীপ্তি।
৯. সংখ্যায় বেড়ে যায় শিক্ষার মাথা
এ শিক্ষা বলবে না আলোকের কথা।
১০. ভালোবাসা ভালো নয় কৈশোরকালে।
জীবন আটকে যায় আান্তির জালে।
উৎসাহী বিতার্কিকগণ এ রকম অজস্র বিষয় রচনা করে কাব্য বিতর্কের চর্চাকে এক নব আনন্দ ও শিক্ষামূলক ধারায় বেগবান করতে পারেন। এ জাতীয় আসর বিতর্কের আকর্ষণবর্ধক। এতে সৃষ্টি হবে নতুন অনুরাগী দর্শক সম্প্রদায় ।
