আজকে আমরা আলোচনা করবো উদ্বুদ্ধকরণের মূলসূত্র

উদ্বুদ্ধকরণের মূলসূত্র
উদ্বুদ্ধকরণ বর্তমান বিশ্বের কঠিনতম শিল্প। আদিম যুগে বা মধ্যযুগীয় অন্ধকারে উদ্বুদ্ধকরণের চেয়ে বর্বরতা বা ঢাল-তলোয়ারের শব্দ অনেক বেশি সমাদৃত ছিল বর্তমান সভ্যতার যুগে পেশিবল বা অস্ত্রের নল কোনোটি দিয়েই মানুষকে স্থায়ীভাবে বশ করা সম্ভব নয় । একবিংশ শতাব্দী যোগাযোগের যুগ, উদ্বুদ্ধ করার যুগ ।
‘আপনি রক্ত দিন, মানবতার সেবা করুন’, কিংবা ‘ধূমপান মানে বিষ পান, ধূমপান ত্যাগ করুন’—এ দুটো স্লোগান ‘সন্ধানী’ এবং ‘আধুনিক’-এর। ‘সন্ধানী’ রক্ত সংগ্রহের জন্য কারও বাসায় গিয়ে গভীর রাতে গায়ের মধ্যে সিরিঞ্জ ঢুকিয়ে দেয় না। অন্যদিকে ‘আধুনিক’ (আমরা ধূমপান নিবারণ করি) সংগঠনটি বিটিসির কারখানায় বোমা ফাটায় না কিংবা কেউ সিগারেট খেলে তার গলা টিপে ধরে না। সর্বত্রই তারা ব্যবহার করেছে উদ্বুদ্ধকরণ প্রক্রিয়া। আবার সস্তা কথায় যে রকম চিড়া ভেজে না, শুধু কথায়, আহ্বানে বা গদগদ বাণীতে সে রকম উদ্বুদ্ধকরণ হয় না ।
উদ্বুদ্ধকরণের মূল ভিত্তি হচ্ছে যুক্তি ও প্রমাণ । ভিত্তি ছাড়া উদ্বুদ্ধকরণ দাঁড়াতে পারে না, কিন্তু শুধু ভিত্তি অর্থাৎ যুক্তি ও প্রমাণ থাকলেই উদ্বুদ্ধকরণ হয় না। এ এক ভিন্ন আর্ট, এক সৃজনশীল কৌশল, এক নক্ষত্রবিশেষ, এক নতুন ইন্দ্রজাল।
ধরুন ‘সন্ধানী’ রক্ত দিতে বলছে। তার পক্ষে তারা কিছু যুক্তি ও প্রমাণ দেখাচ্ছে যে-
তিন মাস পর পর রক্তের সেল নষ্ট হয়ে যায় এবং নতুন সেলের জন্ম হয় । অতএব, তিন মাস পর পর রক্ত দেওয়া যায়।
সুস্থ দেহ নিয়ে রক্ত দিলে স্বাস্থ্যের কোনো ক্ষতি হয় না। অতএব, রক্ত দেওয়া উচিত।
অপরদিকে ‘আধুনিক’-এর যুক্তি, তথ্যপ্রমাণগুলো হচ্ছে:
ধূমপান করলে ক্যানসারের আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি
ধূমপানে ক্ষুধা হ্রাস পায়, ফলে স্বাস্থ্যহানি ঘটে।
এ তথ্যপ্রমাণ ও যুক্তিগুলো কিন্তু ‘সন্ধানী’ বা ‘আধুনিক’-এর আধুনিক আবিষ্কার নয়। এগুলো অনেক আগের। কিন্তু ‘সন্ধানী’ বা ‘আধূনিক’ যে সাফল্য অর্জন করেছে, তা কিন্তু অনেক আগের নয়। এ সাফল্যের মূল কারণ তথ্য বা প্রমাণ আবিষ্কার নয়। ধূমপান যে ক্ষতিকর, এটা আমাদের প্রপিতামহেরাও জানতেন। সাফল্যের মূল কারণ, তথ্য বা প্রমাণগুলোকে দক্ষতার সঙ্গে উদ্বুদ্ধকরণ প্রক্রিয়ায় ব্যবহার করা।

বিচারক হওয়ার আরাম আছে, কথা বলতে হয় না। কষ্ট আছে, পরে পরাজিত বক্তাদের রক্তচক্ষুর জবাবদিহি করতে হয়। একজন বক্তা একবার চার্জ করলেন, ‘আমার আর ওর যুক্তি তো সব এক ছিল। তারপরও ওকে জিতিয়ে দিলেন কেন?’ আমি বললাম, তেল, লবণ, মরিচ, পেঁয়াজ সব রাঁধুনিই দেন, কিন্তু সবার রান্না একরকম স্বাদের হয় না। কথাটা হচ্ছে, কখন কোন বিশেষ উপাদান, কোন শব্দ, কোন আবেগ, কোন বিশেষ মুহূর্তে ব্যবহৃত হবে— তার ওপর নির্ভর করবে উদ্বুদ্ধকরণ কতটুকু সার্থক।
রান্নার উদাহরণ থেকেই ধরুন না, কাঁচা মরিচ যদি রান্নার প্রথমে দিই, তাহলে ঝাল হয়, কিন্তু এটা মাঝামাঝি বা শেষের দিকের একটা বিশেষ সময়ে দিলে ঝালও হবে, ঘ্রাণও হবে। বিতর্কেও সে রকম। যুক্তি বা তথ্যগুলো ঠিক ঠিক সময়ে ব্যবহার করলে যুক্তির শক্তি বৃদ্ধি পাবে। প্রশ্ন হচ্ছে, এই ‘ঠিক’ সময় কোনটি। আসলে এই ‘ঠিক’ সময় পঞ্জিকার অমৃতযোগ’ দেখে বের করা যাবে না। এটা বিতার্কিকের দক্ষতার ওপর নির্ভর করছে, তিনি কীভাবে একটি আবহ সৃষ্টি করবেন এবং দর্শক-শ্রোতার মনের ভাব বুঝে কখন কোন অস্ত্র প্রয়োগ করবেন। উদ্বুদ্ধকরণের দক্ষতা এখানেই।
উদ্বুদ্ধকরণে সাফল্য অর্জনের চাবিকাঠি বা মূলমন্ত্র হচ্ছে অপরের মনস্তত্ত্ব বোঝার ক্ষমতা। শিশুদের টিকা দেওয়া উচিত—এটা আমরা মান্ধাতার আমল থেকেই শুনে আসছি এবং কয়েকটা টিকার দাগও ধারণ করছি। কিন্তু এই টিকাদানকে ব্যাপক অভিযানে পরিব্যাপ্ত করার জন্য কাজে লাগানো হলো কোনো পুলিশের আদেশ নয়, সরকারি নির্দেশ নয়, বরং উদ্বুদ্ধকরণ প্রক্রিয়ায়। এই প্রক্রিয়ায় প্রয়োজন পড়ল অপরের মনস্তত্ত্ব বোঝা এবং সেটা ভালোভাবেই বুঝতে পারল জাতিসংঘের ইউনিসেফ, যারা এ উপমহাদেশে টিকার জন্য উদ্বুদ্ধ করল ক্রিকেট তারকা ইমরান খান, কপিল দেবদের বাণী দিয়ে। ইমরান খান বা কপিল দেব দক্ষ টিকাদার নন। তবু উদ্বুদ্ধকরণ প্রক্রিয়াকে সার্থকতা দিতে অপরের মনস্তত্ত্ব অধ্যয়ন করতে হলো।

অপরের মনস্তত্ত্ব বলতে আমরা বুঝব এ দেশের সাধারণ মানুষের মনস্তত্ত্ব, যাকে উদ্বুদ্ধ করার প্রয়োজন আমাদের। তারাই শ্রোতা, তারাই বিচারক। অতএব, এ ক্ষেত্রে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী প্রফেসর সালাম, কিংবা স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের চেয়ে কোনো চিত্রতারকার অনুরোধ অনেক বেশি কার্যকর- এ যেন যুদ্ধক্ষেত্রে মেঘনাদের শক্তিশেল। কেউ হয়তো বলবেন, ‘উদ্বুদ্ধকরণে সাফল্য আনতে হলে অপরের মনস্তত্ত্ব বুঝতে হবে। এ বড় কঠিন কাজ। এ কী করে সম্ভব? তা ছাড়া আমরা তো আর অন্তর্যামী নই। আসলে অপরের মনস্তত্ত্ব বোঝার জন্য বিতার্কিকের মনস্তত্ত্ববিদ হওয়ার কিংবা কোনো মানসিক হাসপাতালে গিয়ে মনস্তত্ত্বের কর্মশালায় অংশগ্রহণের প্রয়োজন নেই। তার দরকার সাধারণবোধ, যা নাকি আমাদের মধ্যে সাধারণত দুষ্প্রাপ্য।
এমন দৃশ্য আমরা প্রায়ই দেখি, বিতর্ক হচ্ছে মানে চলছে তো চলছেই, পুরু লেন্সের ফাঁক দিয়ে তার্কিক হিং টিং ছটের পণ্ডিতের মতো গড়গড় করে ইংরেজি উদ্ধৃতিসহ তথ্যসমৃদ্ধ পাণ্ডিত্যপূর্ণ কথা বলে যাচ্ছেন। কিন্তু দর্শকেরা সেমিনারের গন্ধ পাচ্ছেন। কেউ-বা হাই তুলছেন, বিচারকেরাও মধ্যাহ্ননিদ্রার কথা ভেবে অনুতাপ করছেন। উদ্বুদ্ধকরণ সম্ভব হলো না। অথচ, হঠাৎ সাধারণ একটি কথা বা প্রবাদ বললেন এবং একে পাণ্ডিত্যপূর্ণ তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে দিলেন। সঙ্গে সঙ্গেই দর্শকেরা আনন্দ পেলেন, পেলেন শিক্ষা, ফেটে পড়ল হাততালি, নিদ্রাভাব বিতাড়িত করে নড়েচড়ে বসলেন বিচারকেরা। লাঙলের মতো তাঁদের কলম নম্বরপত্র কর্ষণ করল।
এখন প্রশ্ন আসতে পারে সাধারণবোধ বা কমনসেন্স শিখব কীভাবে? এর ওপর কি কোনো কর্মশালা হয়? তা হয় বৈকি, তবে এ কর্মশালায় কোনো রেজিস্ট্রেশন ফি লাগে না এবং কোনো সার্টিফিকেটও পাওয়া যায় না। তাহলে কোথায়? আসলে নিত্যদিনের পৃথিবীই আমাদের কমনসেন্সের কর্মশালা।
সরাসরি বলতে গেলে সাধারণবোধ অধ্যয়ন করার তিনটি অনিবার্য উপাদান—স্থান, কাল ও পাত্র। এই জায়গায় কাল ও পাত্র বিচার করে সাধারণবোধের ভিত্তিতে আমরা অপরের বা শ্রোতার যে মনস্তত্ত্ব বুঝতে পারি, তাকে কাজে লাগালেই সার্থক হবে উদ্বুদ্ধকরণ প্রক্রিয়া, যা আবার বিতর্কে সাফল্যের জন্মদাতা।
নিসর্গ-সৌন্দর্যের পিপাসায় সেবার মিরপুর বোটানিক্যাল গার্ডেনে যাওয়ার শখ চাপল। ফার্মগেট থেকে বাসে চড়েছি। লুই পাস্তুরের চেহারাসম্পন্ন এক বৃদ্ধলোক আমার পাশে বসেছেন। হঠাৎ একজন ক্যানভাসার, অর্থাৎ উদ্বুদ্ধকারী এসে বাসে উঠলেন এবং অনেকের কোলের ওপর ছুড়ে দিলেন সাঁতার শিক্ষার লিফলেট। লুই পাস্তুর-সদৃশ বৃদ্ধজনকে দেখলাম চোখের ছয় ইঞ্চি কাছে এনে কাগজটি পড়ছেন। বুঝলাম এ ক্ষেত্রে স্থান ও পাত্র ঠিক আছে কিন্তু কাল ঠিক নেই । যে কালের জন্য এ কাগজ তৈরি করা হয়েছে, সে কাল, অর্থাৎ শৈশব থেকে মধ্যবয়স আমার সহযাত্রী পাস্তর কাকা অনেক আগেই অতিক্রম করেছেন আমিও পড়লাম, ক্যানভাসার বুঝলেন আমার স্থান এবং কাল দুটোই ঠিক, কিন্তু বুঝলেন না, পাত্র ঠিক হয়নি। আমি গ্রামে থাকতেই দুরন্ত ভোগাই নদীতে সাঁতার শিখেছি।
যা-ই হোক, গার্ডেনের এক পুকুরপাড়ে দুজন প্রেমিক-প্রেমিকা বসে প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখছিল, হঠাৎ সে স্থানে গিয়ে হাজির হলো একজন নানা রোগের ওষুধবিক্রেতা । ধরা যাক, পাত্র এবং কাল উভয়ই এখানে ঠিক আছে। কিন্তু ঠিক নেই স্থান। এ স্থান নিসর্গ-সৌন্দর্যের আধার। এ স্থানে বসে কিছু খেতে হয়তো ভালো লাগবে, কিন্তু ভালো লাগবে না ওষুধের ‘লেকচার’ শুনতে।
এভাবে চিন্তা করে বিতার্কিক যদি স্থান, কাল ও পাত্রের সঙ্গে সংগতি রেখে তার পাণ্ডুলিপি প্রস্তুত করেন, তাহলে তিনি পণ্ডিত হয়েও সাধারণকে স্পর্শ করবেন। এই কমনসেন্স বা কাণ্ডজ্ঞান প্রয়োগ করে যখন তিনি দর্শক-শ্রোতার মনস্তত্ত্ব ধরতে পারবেন, তখন তার উদ্বুদ্ধকরণ প্রক্রিয়া সহজতর হবে, হবে কার্যকর। তখন যুক্তি, আবেগ, সাহিত্য, রস, শ্লেষ এগুলো কখন কোনটা প্ৰয়োগ করতে হবে, তা অনুধাবন করা তার পক্ষে সহজতর হয়ে পড়বে। আগের মতো বিচারককে আর অভিযুক্ত করতে হবে না। দর্শক-শ্রোতাকে তিনি যেন ঐন্দ্রজালিক বিদ্যায় বশ করতে পারবেন এবং বিতার্কিক হিসেবে হবেন সার্থকতার বরপুত্র। কারণ, তিনি উপলব্ধি করতে পেরেছেন উদ্বুদ্ধকরণের মূলসূত্র কী।
